স্টাফ রিপোর্টার লুৎফুর রহমান হৃদয় ময়মনসিংহ বিভাগ ।
টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরি, মদন ও মোহনগঞ্জ উপজেলার হাওরাঞ্চলে বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে কয়েক হাজার হেক্টর বোরো ধান। পাকা ধান ঘরে তোলার আগেই পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাওরপাড়ের কৃষক। গরু-ছাগলের খাবার, আগামী মৌসুমের বীজ, মহাজনের দেনা— সব মিলিয়ে চরম দুর্দশায় পড়েছে হাওরবাসী।
*সরেজমিন চিত্র:*
খালিয়াজুরি উপজেলার কীর্তনখোলা হাওরে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠ এখন পানির নিচে। কোথাও কোথাও ধানের শীষ ভেসে আছে। কৃষক রহিম মিয়া বলেন, “৩ একর জমি করছিলাম। ১০ মণ ধানও কাটতে পারি নাই। সব ডুবে গেছে। এনজিও’র কিস্তি, সারের দোকানের বাকি— কেমনে দিমু?”
মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের বিধবা কৃষাণী জাহানারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “স্বামী মারা যাওয়ার পর এই ৬০ শতক জমিই ভরসা। ছেলে-মেয়ে নিয়ে খাইতাম। এখন পোলাপানের মুখে কী দিমু? গরুটার খড়ও ডুইবা গেছে।”
*ক্ষতির পরিমাণ:*
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্যমতে, জেলায় এবার ১ লাখ ৮৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত ১২ হাজার ৭০০ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ ও ৮ হাজার হেক্টর আংশিক তলিয়ে গেছে। টাকার অঙ্কে ক্ষতি প্রায় ২১০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খালিয়াজুরি, মদন, মোহনগঞ্জ ও আটপাড়া উপজেলা।
*বাঁধ নিয়ে ক্ষোভ:*
কৃষকদের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে হাওরের ডুবন্ত বাঁধগুলো সময়মতো মেরামত হয়নি। নিম্নমানের কাজ ও দুর্নীতির কারণে সামান্য পানির চাপেই বাঁধ ভেঙে যায়। খালিয়াজুরির কৃষক সমিতির সভাপতি আব্দুল হক বলেন, “প্রতি বছর মার্চের মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা। এবার এপ্রিলেও কাজ চলছে। দায়সারা কাজ করছে। ফল তো কৃষক ভোগ করল।”
*গো-খাদ্য ও খাবার সংকট:*
ধানের সঙ্গে তলিয়ে গেছে খড়। ফলে গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে গরু-মহিষ পানির দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন। একই সঙ্গে হাওরের গ্রামগুলোতে কাজ না থাকায় দিনমজুরদের খাবার সংকটও প্রকট।
*সরকারি বক্তব্য:*
নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক [নাম] বলেন, “আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করছি। মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের বিনামূল্যে সার-বীজ, কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া হবে।”
পানি উন্নয়ন বোর্ড, নেত্রকোনার নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, “অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও উজানের ঢলের কারণে বাঁধ ভেঙেছে। কোনো অনিয়ম থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
খালিয়াজুরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “ইতোমধ্যে জিআর চাল ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১০ টাকা কেজি চালের কার্ডধারীর সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হবে।”
*বিশেষজ্ঞ মত:*
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. [নাম] বলেন, “হাওরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগাম বন্যা বাড়ছে। স্থায়ী সমাধান হলো ১. বাঁধের উচ্চতা ও মান বাড়ানো, ২. স্বল্প জীবনকালের ধানের জাত সম্প্রসারণ, ৩. আগাম বন্যা পূর্বাভাস জোরদার করা।”
*কৃষকদের দাবি:*
১. ক্ষতিগ্রস্ত সব কৃষককে বিনাসুদে কৃষি ঋণ ও পুরনো ঋণ মওকুফ
২. আগামী আমন মৌসুমের জন্য বিনামূল্যে বীজ, সার, ডিজেল
৩. বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির তদন্ত ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ
৪. ১০০ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্প চালু