
বিশেষ প্রতিবেদক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক: সাংবাদিক মো. সোহেল
"সংঘাত, মুদ্রাস্ফীতি আর চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার চাদরে ঢাকা ইয়েমেনে এখন এক নীরব বিপ্লব ঘটছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার গণ্ডি ভেঙে, বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি আর অদম্য সাহসিকতায় রুটি-রুজির লড়াইয়ে নেমেছেন ইয়েমেনি নারীরা। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাঁরা কেবল নিজেদের সংসারই টিকিয়ে রাখছেন না, পুনর্গঠন করছেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের গ্রামীণ ও জনপদভিত্তিক অর্থনীতি।"
তিমির বিদীর্ণ করে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
দীর্ঘ দশকজুড়ে চলা সংঘাত, অর্থনৈতিক অবক্ষয় এবং বিশ্ব মানবিক সহায়তার চরম সঙ্কটে ইয়েমেনের জনজীবন আজ এক গভীর খাদে নিক্ষিপ্ত। দেশটির মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ বর্তমানে তীব্র খাদ্য সংকটের মুখোমুখি। এমন এক শ্বাসরূদ্ধকর পরিস্থিতিতে পরিবারগুলোর প্রধান উপার্জনক্ষম পুরুষরা হয় যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছেন, নতুবা বেকারত্ব ও জীবনিকারের অভিশাপে বিপর্যস্ত।
ঠিক এই দুর্গম পথেই প্রথাগত সামাজিক বেড়াজাল ও শত বছরের পুরনো ট্যাবুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অর্থনৈতিক ময়দানে আবির্ভূত হয়েছেন ইয়েমেনের নারীরা। রাজধানী সানা থেকে শুরু করে বন্দরনগরী এডেন কিংবা লাহিড়—সবখানেই ক্ষুদ্র ব্যবসা, কুটিরশিল্প, সৌরবিদ্যুৎচালিত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং গ্রামীণ সঞ্চয় ও ঋণদান সমিতির (VSLA) মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার অনন্য নজির স্থাপন করছেন তাঁরা।
মানবিক বিপর্যয় ও টিকে থাকার আকুতি
জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের প্রায় ৭৪ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। কোটি কোটি শিশু ও গর্ভবতী নারী তীব্র পুষ্টিহীনতার শিকার। আন্তর্জাতিক মানবিক তহবিলগুলোর অর্থায়ন নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাওয়ায় যখন ত্রাণ সহায়তা প্রায় বন্ধের উপক্রম, তখন ইয়েমেনের নারীরা হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি।
স্থানীয় নারী উদ্যোক্তা তামানি মুহাম্মদ (যিনি ইয়েমেনে মধু বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন) তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, "নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং বেকারত্বের তীব্রতা আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। বেঁচে থাকার তাগিদেই আজ নারীদের এই কর্মক্ষেত্রে নামতে হয়েছে, যা এখন সময়ের সবচেয়ে নিষ্ঠুর অথচ অবধারিত সত্য।"
সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ভেঙে নতুন দিগন্ত
ঐতিহ্যগতভাবে ইয়েমেনের রক্ষণশীল সমাজে কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত (মাত্র ৬ শতাংশের কাছাকাছি)। কিন্তু ক্ষুধা ও জীবনসংগ্রামের কাছে পিছু হটেছে সেই রক্ষণশীলতা। ইয়েমেনের ন্যাশনাল কমিটি ফর উইমেনের চেয়ারপারসন শাফিকা সাঈদ আবদো জানান, "প্রাথমিকভাবে সমাজ এই পরিবর্তনকে সহজে মেনে নেয়নি। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নারীদের আপসহীন সততা, নিষ্ঠা এবং অবিচল উপস্থিতি পুরো সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। আজ পরিবার ও সমাজ তাঁদের এই সংগ্রামকে সম্মানের চোখে দেখছে।"
গ্রামীণ জনপদে বিশ্বব্যাংক ও ইউএনডিপি (UNDP)-এর সহযোগিতায় গড়ে ওঠা ভিলেজ সেভিংস অ্যান্ড লোন অ্যাসোসিয়েশনের (VSLA) মাধ্যমে নারীরা সঞ্চয় ও ক্ষুদ্র ঋণের সুযোগ পাচ্ছেন। কেউ বেকারি পণ্য তৈরি করছেন, কেউ তিল ভাঙানোর মিল চালাচ্ছেন, আবার কেউ সোলার প্যানেলের সাহায্যে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটাচ্ছেন। ই-ওয়ালেট বা ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের ছোঁয়ায় তাঁরা নিজেদের আয় পরিচালনা করছেন আরও স্বাধীন ও নির্ভুলভাবে।
অনুসন্ধানী দৃষ্টি ও সাংবাদিকীয় মূল্যায়ন
সাংবাদিকতার সর্বোচ্চ নৈতিক মানদণ্ড, নিখুঁত উপাত্ত এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—ইয়েমেনি নারীদের এই ঘুরে দাঁড়ানো কেবল অর্থনৈতিক বেঁচে থাকার লড়াই নয়; এটি মানব সভ্যতার টিকে থাকার এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা এবং জেন্ডার সমতার মানদণ্ডকে সামনে রেখে এই নারীরা প্রমাণ করেছেন যে, চরম সংকটকালেও সঠিক সুযোগ এবং সহায়তা পেলে তাঁরা সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী ইঞ্জিন হয়ে উঠতে পারেন।
ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া ইয়েমেনে এই নারী উদ্যোক্তারা আজ কেবল তাঁদের ক্ষুধার্ত সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছেন না, তাঁরা আগামী দিনের একটি নতুন, স্বাবলম্বী এবং ঘুরে দাঁড়ানো ইয়েমেনের স্বপ্ন বুনছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মানবিক সংস্থাগুলোর উচিত এই লড়াকু নারীদের পাশে আরও শক্তভাবে দাঁড়ানো—যাতে আশার এই ক্ষুদ্র প্রদীপটি কখনো নিভে না যায়।