নিজস্ব প্রতিবেদক : জীবন দেওয়ান উজ্জ্বল
তারিখ : ২৮ মে ২০২৬ ইং
পবিত্র ঈদুল আজহা মানেই ত্যাগ, আনন্দ ও কোরবানির মাংস ভাগাভাগির উৎসব। সারাদেশে যখন ঈদের আনন্দে মুখরিত ছিল ঘরে ঘরে, কোরবানির পশু জবাই ও মাংস বিতরণে ব্যস্ত ছিল মানুষ, ঠিক তখনই কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের গোয়াইলপুরী এলাকায় দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। ঈদের দিনটিও সেখানে কেটেছে হতাশা, দুঃখ আর নদীভাঙনের আতঙ্কে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদের অব্যাহত ভাঙনে বছরের পর বছর ধরে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে গোয়াইলপুরী এলাকার শত শত পরিবার। এবারের ঈদেও সেই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মেলেনি তাদের। এলাকাটির প্রায় ২৫০টি পরিবারের কেউই কোরবানির মাংসের স্বাদ পাননি। অনেকেই সারাদিন অপেক্ষা করেও পাননি এক টুকরো মাংস। ফলে ঈদের আনন্দ যেন অধরাই থেকে গেছে এসব খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে।
ঈদের দিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেন স্থানীয় ৮নং ওয়ার্ড সদস্য আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, “সারাদেশে যখন মানুষ ঈদ উৎসব ও কোরবানির মাংস খাওয়ায় ব্যস্ত, তখন গোয়াইলপুরী এলাকার ২৫০ পরিবারের কারো ভাগ্যে জোটেনি এক টুকরো কোরবানির মাংসও। এ এলাকার অধিকাংশ মানুষই দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী। তাদের পক্ষে কোরবানি দেওয়া তো দূরের কথা, বাজার থেকে গরুর মাংস কিনে খাওয়াও সম্ভব হয়নি। অল্প কিছু পরিবার ব্রয়লার মুরগি কিনে রান্না করেছেন।”
তিনি আরও জানান, ঈদের আনন্দের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে নদীভাঙনের আতঙ্ক। গত এক মাসে ব্রহ্মপুত্রের ভয়াবহ ভাঙনে অন্তত ২০ থেকে ২৫টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে একটি মাদরাসাসহ আরও অসংখ্য ঘরবাড়ি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে কয়েকটি পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আমেনা বেওয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“হামার এলাকার সগাই খাটি খাওয়া মানুষ। কোরবানি তো দুরের কথা, গোশতো কিনি খাওয়ারও উপায় নাই। সকাল থাকি বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষায় ছিনু, কাইয়ো এক টুকরো গোশতোও দেইল না। এবার আর কোরবানির গোশতোর স্বাদ পাইলোং না।”
তার এই আক্ষেপ যেন পুরো গোয়াইলপুরী এলাকার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। ঈদের দিনে যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে বিত্তবানরা গরু-ছাগল কোরবানি দিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন, তখন এই চরের মানুষগুলো ছিলেন সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, তাদের পাশে দাঁড়ায়নি কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতা কিংবা প্রশাসনের কেউ।
এ বিষয়ে যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর বলেন,
“প্রতিবছর এসব চরে কিছু গরু কোরবানি হলেও এবার আমার জানামতে গোয়াইলপুরীতে কোনো গরু কোরবানি হয়নি। এলাকার অধিকাংশ মানুষই নিম্ন আয়ের হওয়ায় তাদের কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য নেই।”
স্থানীয়দের দাবি, শুধুমাত্র ঈদের সময় সহানুভূতি দেখালেই হবে না; স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি দুর্গত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
গোয়াইলপুরীর মানুষের এবারের ঈদ তাই উৎসবের নয়, বরং বেদনা, আতঙ্ক আর বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি হয়ে রইলো।