নিজস্ব প্রতিবেদক:- জীবন দেওয়ান উজ্জ্বল
“টাকা ছাড়া কি মানুষের কোনো মূল্য নেই?”— এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। এক প্রবাসী সন্তানের মরদেহ দেশে আনা নিয়ে পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং মায়ের আচরণকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা ও আবেগঘন প্রতিক্রিয়া।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি হৃদয়বিদারক ঘটনার বর্ণনায় উঠে এসেছে, দীর্ঘদিন প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করা এক বাংলাদেশি যুবক মৃত্যুর পর লাশ হয়ে দেশে ফেরেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, মরদেহ দেশে আনতে প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ হবে শুনে নিহতের মা নাকি ছেলের মরদেহ দেশে আনতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন এবং টাকাটাই গ্রহণ করতে চান।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—একজন গর্ভধারিণী মা কীভাবে সন্তানের মরদেহ দেশে আনতে আপত্তি করতে পারেন? আবার অনেকেই বলছেন, ঘটনার পেছনের প্রকৃত বাস্তবতা যাচাই না করে সামাজিকভাবে কাউকে দোষারোপ করা উচিত নয়।
স্থানীয় সূত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যে জানা যায়, প্রবাসে মারা যাওয়া ওই যুবকের মরদেহ দেশে পাঠাতে প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয় হবে বলে নিহতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন সংশ্লিষ্ট কফিল বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি। তখন পরিবারের পক্ষ থেকে মরদেহ না এনে অর্থ পাঠানোর কথা বলা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
তবে নিহতের স্ত্রী স্বামীর মরদেহ দেশে এনে শেষবারের মতো দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি বারবার পরিবারের সদস্যদের অনুরোধ করেন এবং শেষ পর্যন্ত তার চেষ্টাতেই মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয় বলে জানা যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যে আরও দাবি করা হয়, মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর নিহতের মা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান এবং জনসম্মুখে মরদেহে লাথি মারেন। যদিও এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্ভরযোগ্য তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই লিখছেন, “একজন মা সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। সেই মা যদি সন্তানের মরদেহও গ্রহণ করতে না চান, তাহলে সমাজ কোন দিকে যাচ্ছে?”
আবার অনেকে বলছেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা মানসিক অবস্থার বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। শুধুমাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের ভিত্তিতে পুরো ঘটনা বিচার করা ঠিক হবে না বলেও মত দিয়েছেন সচেতন মহল।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা সমাজে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, অর্থকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা এবং পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েনকে সামনে এনে দিয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসজীবনের কষ্ট, পরিবারের প্রত্যাশা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে অনেক সময় সম্পর্কগুলো ভেঙে পড়ে—এই ঘটনাকে অনেকে তারই নির্মম উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চা না থাকলে অর্থই একসময় সম্পর্কের প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। আর তখন মানুষ আবেগের চেয়ে আর্থিক হিসাবকে বড় করে দেখতে শুরু করে, যা সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ঘটনার সত্যতা ও প্রকৃত প্রেক্ষাপট যাই হোক না কেন, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—মানবিক সম্পর্কের মূল্য কখনোই অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একজন প্রবাসী সন্তানের জীবনের ত্যাগ, পরিবারের প্রতি ভালোবাসা এবং মৃত্যুর পর তার শেষ বিদায়—এসবের সঙ্গে অর্থের হিসাব জড়িয়ে পড়া নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
সচেতন মহল বলছে, সমাজে মানবিকতা, পারিবারিক বন্ধন ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।