সোহেল খান দূর্জয়-নেত্রকোনা : নেত্রকোনা জেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বেদে সম্প্রদায় দু’মুঠো খাবারের জন্য লড়াই সংগ্রাম করে দিন কাটাচ্ছে। তারা কীভাবে জীবনযাপন করে, বাস্তবে না দেখলে বোঝার উপায় নেই। বেশিরভাগ বেদে সম্প্রদায়ের পরিবার খোলা আকাশের নিচে তাঁবু খাটিয়ে বাস করছেন।সরেজমিনে গিয়ে তাদের সাথে কথা বলে জানা যায় নেত্রকোনা জেলায় বেশিরভাগ বেদে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলা থেকে এসেছেন।নেত্রকোনা সদর উপজেলার ঠাকুরাকোনায় যে বেদে পরিবারগুলো বসবাস করছেন তারা খোলা আকাশের নিচে তাঁবু খাটিয়ে বসবাস করছে। এ ছাড়াও জেলার মোহনগঞ্জ এবং বারহাট্টা ও কলমাকান্দায় মহাসড়কের পাশে কিছু বেদে বসবাস করছে তাবু ঘেরে। এই সম্প্রদায়ের একমাত্র পেশা সাপ ধরা, গ্রামে গ্রামে সাপের খেলা দেখানো, বানর খেলা ও বিভিন্ন রোগের তাবিজ বিক্রি করা। কেউ কেউ পুকুরে হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণ খোঁজার কাজও করেন।
সরেজমিনে গিয়ে তাদের জীবন সংগ্রামের কথা জানতে চাইলে তারা বলেন, এই সামান্য আয় দিয়ে কোনোরকমে খেয়ে না খেয়ে চলে তাদের জীবন। তবে এখন সাপের খেলা, বানরের খেলাসহ তাবিজের প্রতি মানুষের বিশ্বাস কমে গেছে। তার পরও তারা বাপদাদার পেশা যুগের পর যুগ ধরে রেখেছেন। কুসংস্কার ও উদাসীনতার কারণে বেদেরা শিক্ষার আলো ও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত থাকায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম অন্ধকারেই পড়ে আছে তারা। আরও জানা যায়, ফলে সচেতনতার অভাবে বেশিরভাগ সময়ই ওরা স্বাস্থ্যহীনতায় ভোগে। এমনকি অনেক সময় ওদের কেউ কেউ কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণও করে। শিক্ষার আলো না থাকায় বাইরের জগৎ থেকে ওরা আলাদা। বহির্বিশ্ব সম্পর্কে জানার আগ্রহও ওদের নেই। ওরা দুই বেলা দুই মুঠো খেয়ে পরে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে। এদিকে রবিবার (১লা নভেম্বর) সকালে ঠাকুরাকোনা, বারহাট্টা ও মোহনগঞ্জ উপজেলায় বেদে সম্প্রদায়ের বসবাসস্থলে গিয়ে দেখা গেছে তাদের এই করুণ চিত্র। দুই বেলা খাবারের জন্য কেউ কেউ গ্রামের নিভৃত পল্লীতে সাপের খেলা, বানরের খেলাসহ তাবিজ বিক্রির জন্য বেরিয়ে গেছেন। সকালের খাবার খাচ্ছেন সেখানকার ছেলেমেয়েরা। কোনো মাছ-মাংস নেই। শুধুই সাদা ভাত ও সবজি দিয়ে ক্ষুধানিবারণের জন্য শিশুরা সকালের খাবার খাচ্ছে। তারা কী খেয়ে বেঁচে আছে এবং কীভাবে জীবনযাপন করছে এতটুকু খোঁজখবর নেওয়ার জন্য এই জগতে কেউ নেই বলে জানান বেদে সম্প্রদায়ের এই লোকজন।
নেত্রকোনা সদর উপজেলার ঠাকুরাকোনায় বেদে পল্লীর শিশু সাজিরুলের (৯) সঙ্গে কথা হলে সে বলে,স্যার আমরা ‘ভালো নেই, আমরা গরিব ঘরের সন্তান, ঠিকমতো দুই বেলা খেতে পারি না, মা সারা দিন দুইশ থেকে তিনশ টাকা আয় করে তা দিয়ে কি হামার জীবন চলে। হামার ঠিকমতো খাবার জোটে না আবার পড়াশুনা করব কীভাবে। আমাদের দেখছেন না আমরা তাঁবুতে থাকি। আপনারা তো ধনী মানুষ বড় বড় ঘরে থাকেন ভালো ভালো খাবার খান। প্রতিদিনই কোনোরকমে সাদা ভাত আর সবজি দিয়ে আমাদের দুই বেলা খাবার জোটে। কোনো কোনো দিন খাবার জোটে না। সেদিন না খেয়ে থাকতে হয়। আমরার নাই ভালো জামাকাপড়, লেখাপড়ার জন্য মনটা চায় কিন্তু দুই বেলা খাবারের জন্য দেশবিদেশে বাবার সঙ্গে থাকতে হয়। কী করে স্কুলে যাব। ঠাকুরাকোনায় বসবাস করা বেদে সম্প্রদায়ের সর্দার (কাল্পনিক নাম) কামরুল (৬০) বলেন, ‘শুধু আমরা নই, আমাদের মতোই অনেক বেদে সম্প্রদায় আছে। তারাও আমাদের মতো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খোলা আকাশের নিচে তাঁবুতে বসবাস করছে। বাপদাদার পেশা যুগের পর যুগ ধরে রেখেছি। আমরা জানতে চেয়েছিলাম আপনাদের।সন্তানদেরও এ পেশায় আনবেন কি না। নূপুর বেগম (৩৫) তখন মনে কষ্ট নিয়ে বলেন, ‘কী করব, আমাদের দেশের বাড়িতে নিজেদের কোনো জায়গাজমি নাই, নির্দিষ্ট জায়গা না থাকলে সন্তানদের পড়াব কীভাবে? আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি আমাদের যদি কোনো ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে সন্তানদের আমরা লেখাপড়া করাতে পারব। আমরা চাই না আমাদের মতো আমাদের সন্তানরা এ পেশায় আসুক।
০১-১১-২০২৬
সম্পাদক ও প্রকাশক মাহাদী হাসান,
নির্বাহী সম্পাদক মেহেদী হাসান,
কপি রাইট কতৃক অনুমোদিত