আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রতিবেদক: মো. সোহেল
ব্রিটিশ রাজনীতির দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর পটপরিক্রমায় অবসান ঘটতে চলেছে এক অনিশ্চিত অধ্যায়ের। কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টির ক্ষমতার পালাবদল এবং দীর্ঘমেডিক্যাল টার্মলয়েডের পর অবশেষে যুক্তরাজ্যের মসনদে আনুষ্ঠানিকভাবে আরোহণ করতে চলেছেন লেবার পার্টির অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক জনপ্রিয় মেয়র অ্যান্ড্রু বার্নহ্যাম (Andy Burnham)। বাকিংহাম প্রাসাদে মহামান্য রাজা চার্লসের সাথে সাক্ষাত এবং ঐতিহাসিক ‘কিসিং অব হ্যান্ডস’ আনুষ্ঠানিকতা শেষে আজ সোমবারই আনুষ্ঠানিকভাবে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের চাবিকাঠি চলে যাচ্ছে তাঁর হাতে। এর মধ্য দিয়ে গত এক দশকের অস্থির রাজনৈতিক ইতিহাসে যুক্তরাজ্য পেতে যাচ্ছে তাদের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী। বিশ্ব রাজনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলে ব্রিটিশ রাজনীতি ও অর্থনীতির টেবিলে ঠিক কী ধরনের সমীকরণ তৈরি হতে যাচ্ছে এবং এই ক্ষমতার পালাবদলের পর বিশ্বমঞ্চে কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে গভীর চুলচেরা বিশ্লেষণ।
ক্ষমতা গ্রহণের নেপথ্য প্রেক্ষাপট ও বর্তমান পরিস্থিতি
গত দুই বছর ধরে কিয়ের স্টারমারের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন নীতিগত হোঁচট, জনরোষ এবং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপের মুখে গত মাসে স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণা ব্রিটিশ রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব শূন্যতার সৃষ্টি করেছিল। এই রাজনৈতিক সংকটের ঘূর্ণাবর্ত থেকে দলকে রক্ষা করতে লেবার পার্টির অভ্যন্তরে একমাত্র প্রার্থী হিসেবে বিপুল সংখ্যক আইনপ্রণেতার সমর্থন নিয়ে দলের শীর্ষ পদে আসীন হন অ্যান্ড্রু বার্নহ্যাম। তবে ঐতিহ্যগতভাবে সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই দলের প্রধান পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের এই প্রক্রিয়া ব্রিটিশ শাসনতন্ত্রের নিয়মতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা হলেও, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বার্নহ্যামের জন্য পথটি মসৃণ হবে না বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
হোঁচট খাওয়া অর্থনীতি ও বার্নহ্যামের নতুন কর্মপরিকল্পনা
দায়িত্ব গ্রহণের আগেই বার্নহ্যাম স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, দেশের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হতে হবে অত্যন্ত সাহসিকতা ও সততার সাথে। তাঁর সরকারের প্রাথমিক এজেন্ডায় রয়েছে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় কমানো, সাধারণ মানুষের গৃহস্থালি জ্বালানি বিলের বোঝা লাঘব করা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার ঢেলে সাজানো। এছাড়া, নর্থ সি বা উত্তর সাগর থেকে নতুন করে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়ার গুঞ্জন রয়েছে, যা একদিকে শিল্প অর্থনীতিকে চাঙ্গা করলেও অন্যদিকে পরিবেশবাদী ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করা দলগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বার্নহ্যামের এই কর্মপন্থা একাধারে বামপন্থী জনকল্যাণমুখী ভাবমূর্তির সাথে প্রো-বিজনেস বা ব্যবসায়ীবান্ধব নীতির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। বিশেষ করে ইউটিলিটি সার্ভিস বা জনসেবামূলক খাতগুলোকে পুনরায় জনস্বার্থে বা সরকারি নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার যে রূপরেখা তিনি দিয়েছেন, তা যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং গত এক দশকে দ্রুত প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের ইতিহাস আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে লন্ডনের নীতিনির্ধারণী স্থায়িত্ব নিয়ে এক ধরনের সংশয় তৈরি করেছিল। অ্যান্ড্রু বার্নহ্যাম তাঁর প্রথম ভাষণে বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাজ্যের কার্যকর ও স্থিতিশীল সরকারের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির বর্তমান জটিল সময়ে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্য সংকট থেকে শুরু করে ইউরো-আটলান্টিক নিরাপত্তা কাঠামোর নানামুখী চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান, সেখানে বার্নহ্যামের প্রশাসন কীভাবে বৈদেশিক নীতি ও প্রতিরক্ষা বাজেট পুনর্বিন্যাস করে, সেটাই দেখার বিষয়। বিশেষ করে কল্যাণমূলক খাতের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতে সম্ভাব্য অগ্রাধিকার দেওয়ার গুঞ্জন আন্তর্জাতিক কৌশলগত মিত্রদের মধ্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এরপর কী ঘটবে? আগামীর রূপরেখা
সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ডাউনিং স্ট্রিটে নিজের নতুন মন্ত্রীসভা ও ক্যাবিনেট গঠনের কাজ শুরু করবেন বার্নহ্যাম। তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিভক্ত জনমতকে এক সুতোয় বাঁধা এবং লেবার পার্টির ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামাল দিয়ে একটি স্থিতিশীল প্রশাসনিক কাঠামো উপহার দেওয়া। দীর্ঘ এক দশকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতি কাটিয়ে অ্যান্ড্রু বার্নহ্যামের হাত ধরে যুক্তরাজ্য সত্যিকারের কোনো দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার দেখা পাবে, নাকি এটিও ক্ষমতার আরেকটি ক্ষণস্থায়ী পালাবদল হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাবে—এখন সেটাই মূল দেখার বিষয়। বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি এবং ইউরোপীয় ভূ-রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ডাউনিং স্ট্রিটের এই নতুন অধ্যায় অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।