হাকিকুল ইসলাম খোকন এমপি নাসির,হেলাল মাহমুদ, আরিফুর রহমান আরিফ, বাপসনিউজঃ ক্ষমতার লোভ, অন্ধ উচ্চাভিলাষ এবং লাশের ওপর খুনি জিয়াউর রহমানের মসনদ দখলের এক রক্তক্ষয়ী দলিল
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকচক্র জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। ৩ নভেম্বর কারাগারে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। এর মাত্র চার দিন পর, ৭ নভেম্বর থেকে সশস্ত্র বাহিনীতে শুরু হয় বর্বরোচিত মুক্তিযোদ্ধা ও সৈনিক নিধনযজ্ঞ।
▪️ অভ্যুত্থানের নামে শীর্ষ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ঠান্ডা মাথায় খুন
৭ নভেম্বর তথাকথিত ‘সিপাহি বিপ্লব’-এর নামে ঢাকা সেনানিবাসে প্রথমেই হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের তিন সমরনায়ককে। খালেদ মোশাররফ (বীর উত্তম) ছিলেন ২ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক ও ‘কে ফোর্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা; ঢাকার ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ তাঁর সেক্টরেরই সৃষ্টি। কে এন হুদা (বীর উত্তম) ছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্ত এবং ৮ নম্বর সেক্টরের একটি সাব-সেক্টরের অধিনায়ক। এ টি এম হায়দার (বীর উত্তম) অসংখ্য গেরিলাকে প্রশিক্ষণ দেন এবং পরে ২ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক হন। দশম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদর দপ্তরে ক্যাপ্টেন আসাদ ও ক্যাপ্টেন জলিল ঠান্ডা মাথায় এই তিন বীরকে গুলি করে হত্যা করেন।
ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহ্যাস তাঁর ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ গ্রন্থে লিখেছেন, “এ দিন উচ্ছৃঙ্খল জওয়ানরা একজন মহিলা চিকিৎসকসহ ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করে। এমনকি একজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রীকেও এ সময় হত্যা করা হয়।”
▪️ বন্দিদশা থেকে জিয়ার মুক্তি ও বেপরোয়া ক্ষমতা দখল
৬ নভেম্বর দিবাগত রাতে ১৫ আগস্টের খুনি ল্যান্সার মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে ফারুকের ল্যান্সার বাহিনী গৃহবন্দি জিয়াকে মুক্ত করে দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টের দপ্তরে নিয়ে আসে। গবেষক গোলাম মুরশিদ তাঁর ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর: একটি নির্দলীয় ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, মুক্ত হয়েই জিয়া রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েমের অনুমতি না নিয়ে সোজা বেতারে গিয়ে নিজেকে ‘প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক’ ঘোষণা করেন, পরে যা বদলে ‘উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক’ করা হয়।
▪️ জিয়ার শাসনকাল: অভ্যুত্থানের ঘনঘটা ও পাইকারি বিচারবহির্ভূত হত্যা
জিয়ার শাসনকালে ২০টিরও বেশি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে, গড়ে প্রায় প্রতি তিন মাসে একটি। গোলাম মুরশিদের মতে, প্রতিটি অভ্যুত্থানের পর বহু সেনাসদস্যকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়, বিনা বিচারে দেওয়া হয় গণকবর। গবেষক মার্কাস ফ্র্যান্ডা তাঁর ‘বাংলাদেশ: দ্য ফার্স্ট ডিকেড’ গ্রন্থে লিখেছেন, ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর বিমান বাহিনীর অভ্যুত্থানের পর দমনপীড়নে প্রায় আড়াই হাজার সেনাসদস্য নিহত হন। মুরশিদের তথ্যমতে, বিমান বাহিনীতে মাত্র ১১ জন কর্মকর্তা বেঁচে ছিলেন, যাঁদের মধ্যে বিমান চালাতে পারতেন মাত্র তিনজন।
▪️ ইনডেমনিটি বৈধকরণ ও খুনিদের রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধে খন্দকার মোশতাক ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করেন। জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সেই কালো আইনকে সংবিধানভুক্ত করেন। খুনিদের বিদেশে দূতাবাসে উচ্চপদে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। এভাবেই সূচনা হয় বিচারহীনতার অন্ধকার যুগের।
▪️ জিয়ার করুণ পরিণতি এবং প্রহসনের বিচার
ষড়যন্ত্র ও রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত এই স্বৈরশাসনের শেষ পরিণতিও ছিল রক্তাক্ত। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। এরপর মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রাখা মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরকে আটক করে কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই সামরিক হেফাজতে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে সাত্তার সরকার প্রহসনের বিচারে আরও এক ডজন মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাকে ফাঁসিতে ঝোলায়।
▪️ ইতিহাসের রায়
খালেদ-হুদা-হায়দার থেকে মঞ্জুর পর্যন্ত, একে একে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে রণাঙ্গনের বীরদের। অভ্যুত্থান দমনের নামে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলেছেন, গণকবরে হারিয়ে গেছেন হাজারো সাধারণ সৈনিক। তাঁদের অনেকের স্বজন আজও জানেন না, প্রিয় মানুষটির কবর কোথায়। এটি কোনো বিপ্লব ছিল না; ছিল সশস্ত্র বাহিনী থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের মুছে ফেলার এক পরিকল্পিত রক্তাক্ত অধ্যায়, যার রক্ত চাপা দিতে চাওয়া হয়েছে ইনডেমনিটির কালো আইনে।
সেদিনের রক্ত আজও বিচার চায়।
সম্পাদক ও প্রকাশক মাহাদী হাসান,
নির্বাহী সম্পাদক মেহেদী হাসান,
কপি রাইট কতৃক অনুমোদিত