
মোঃ শাহজাহান বাশার
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
আদর্শবিহীন সাংবাদিকতা যে কোনো সময় চিৎপটাং। কথাটি শুধু একটি উক্তি নয়; এটি আজকের গণমাধ্যম বাস্তবতার এক নির্মম সতর্কবার্তা।
সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি সমাজের বিবেক, রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। সত্য অনুসন্ধান, জনস্বার্থ রক্ষা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীক অবস্থানই সাংবাদিকতার মৌলিক আদর্শ। কিন্তু যখন এই আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক আনুগত্য, অর্থের প্রলোভন কিংবা ক্ষমতার ছায়ায় সংবাদ পরিবেশিত হয়, তখন সাংবাদিকতা তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে শুরু করে।
আজ প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে তথ্য প্রচারের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বিভ্রান্তিকর তথ্য, গুজব এবং অপসাংবাদিকতার ঝুঁকিও। কিছু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যবহার করছেন ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়, প্রভাব বিস্তার কিংবা প্রতিপক্ষকে হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রকৃত সাংবাদিকদের সম্মান, আর সাধারণ মানুষের আস্থাও নষ্ট হচ্ছে।
সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বাস। পাঠক বা দর্শক যখন মনে করেন কোনো সংবাদমাধ্যম নিরপেক্ষ, সত্যনিষ্ঠ এবং দায়িত্বশীল, তখনই সেই মাধ্যম সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। কিন্তু একবার যদি সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরে, তবে আধুনিক প্রযুক্তি বা বাহ্যিক চাকচিক্য কোনো কিছুই সাংবাদিকতাকে টিকিয়ে রাখতে পারে না। তাই বলা যায়, আদর্শবিহীন সাংবাদিকতা সত্যিই যে কোনো সময় চিৎপটাং হয়ে পড়তে পারে।
সাংবাদিকদের মনে রাখতে হবে, কলম কিংবা ক্যামেরা কখনো ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার অস্ত্র হতে পারে না। এগুলো মানুষের অধিকার রক্ষা, দুর্নীতি উন্মোচন, ন্যায়বিচারের পক্ষে জনমত গঠন এবং সমাজকে আলোকিত করার শক্তিশালী মাধ্যম। এই দায়িত্ব পালনে সততা, নৈতিকতা, পেশাগত দক্ষতা ও জবাবদিহির কোনো বিকল্প নেই।
একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। যোগ্যতা, নৈতিকতা এবং পেশাগত মানদণ্ডকে অগ্রাধিকার দিয়ে সাংবাদিক তৈরির পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষণ, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা এবং আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি ছাড়া সুস্থ সাংবাদিকতা গড়ে ওঠে না।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যেসব গণমাধ্যম সত্যের পাশে থেকেছে, জনগণের আস্থা অর্জন করেছে, তারাই সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। আর যারা সাময়িক সুবিধার জন্য নীতি বিসর্জন দিয়েছে, তারা একসময় জনবিচ্ছিন্ন হয়ে ইতিহাসের প্রান্তে হারিয়ে গেছে।
সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে প্রযুক্তির ওপর নয়; নির্ভর করে নৈতিকতা, আদর্শ এবং জনগণের আস্থার ওপর। তাই প্রতিটি সাংবাদিকের শপথ হওয়া উচিত—সংবাদ হবে সত্যের, কলম হবে ন্যায়ের, আর অবস্থান হবে জনস্বার্থের পক্ষে।
কারণ,আদর্শবিহীন সাংবাদিকতা হয়তো কিছুদিন টিকে থাকতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার পরিণতি একটাই—চিৎপটাং।