
সিলেট প্রতিনিধি নিয়াজ খান
“আমি ধর্ষণ করেছি, পারলে কিছু কর! তোরা কী করবি কর, চেয়ারম্যান আমার আত্মীয়!”—এমনই চরম ঔদ্ধত্য ও দম্ভোক্তি নিয়ে দীর্ঘ এক মাস দাপিয়ে বেড়িয়েছে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের এক ১১ বছরের শিশুর ধর্ষক। অবশেষে প্রশাসনের জালে বন্দী হয়েছে সেই অপরাধী। তবে এই জঘন্য অপরাধের ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে ও আত্মীয় রূপী ধর্ষককে বাঁচাতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শওকত আলী মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়েছিলেন বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। চেয়ারম্যানের তীব্র বাধা, ভয়ভীতি ও হুমকির দেয়াল ভেঙে দীর্ঘ এক মাস পর আদালতের নির্দেশে মামলাটি রুজু করেছে পুলিশ।
চেয়ারম্যানের ‘আত্মীয়’ কোটায় ক্ষমতার দম্ভ:
অনুসন্ধানে জানা যায়, ধর্ষক অত্র ইউপি চেয়ারম্যান শওকত আলীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। ধর্ষণের পরপরই যখন বিষয়টি জানাজানি হয়, তখন ধর্ষক নিজেই চেয়ারম্যানের ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারকে হুমকি দেয়। অন্যদিকে, স্বজনপ্রীতির চাদরে অপরাধীকে ঢাকতে মাঠে নামেন খোদ চেয়ারম্যান। দীর্ঘ এক মাস ধরে ভুক্তভোগী অসহায় পরিবারটিকে নানামুখী প্রলোভন, সামাজিক মান-সম্মান ক্ষুণ্ন করা এবং এলাকা ছাড়া করার হুমকি প্রদান করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। চেয়ারম্যানের এমন আগ্রাসী ভূমিকার কারণে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা পরিবারটি প্রথমে থানায় যাওয়ার সাহস পর্যন্ত পায়নি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড়, অতঃপর গ্রেফতার:
ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও যখন কোনো বিচার মিলছিল না, তখন স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিষয়টি জানাজানি হয়। সচেতন মহল ও এলাকার সাধারণ মানুষ ধর্ষকের এমন ঔদ্ধত্য এবং চেয়ারম্যানের পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সোচ্চার হন। বিষয়টি ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর চারদিকে তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে। জনরোষ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের পর অবশেষে পুলিশ তৎপর হয় এবং অভিযুক্তকে খাঁচায় বন্দী করতে সক্ষম হয়।
যা বললেন থানার ওসি:
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (
সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি) রতন শেখ পিপিএম সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন আদালত নির্দেশে মামলা রুজি করি দ্রুততম সময়ের মধ্যে অভিযান পরিচালনা করে সিলেট মেট্রোপলিটন এয়ারপোর্ট থানার সহযোগিতা আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হই এয়ারপোর্ট থানা এলাকা থেকে
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হলে হয় অত্র ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে
পর্দার আড়াল থেকে সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন।
আপস-মীমাংসার নামে চেয়ারম্যানের দায়সারা সাফাই:
অভিযোগের পাহাড় সামনে আসার পর গৌরারং ইউপি চেয়ারম্যান শওকত আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজের দোষ ঢাকতে এক অদ্ভুত সাফাই পেশ করেন। তিনি বলেন,
”ধর্ষণের শিকার শিশুটির পরিবার প্রথমে আমার কাছে এসেছিল। আমি তখন তাদের থানায় যাওয়ার কথা বলি। পরে উভয় পক্ষ যখন নিজেরা আপস-মীমাংসার জন্য আমার কাছে আসে, তখন আমি ভেবেছিলাম দুই পক্ষ মিলেমিশে গেলে বিষয়টি এখানেই শেষ হয়ে যাবে।”
আইন অনুযায়ী ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর ফৌজদারি অপরাধে কোনো ধরনের ‘আপস বা সালিশ’ করার সুযোগ না থাকলেও, একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে চেয়ারম্যানের এমন বক্তব্য অপরাধীকে সরাসরি মদদ দেওয়ার শামিল বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।
জনমনে ক্ষোভ: চেয়ারম্যানেরও শাস্তি দাবি:
আইনের হাত থেকে বাঁচতে ধর্ষকের সেই দম্ভোক্তি—“চেয়ারম্যান আমার আত্মীয়, পারলে কিছু কর”—এখন গৌরারং ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। এলাকার সর্বস্তরের মানুষ মনে করেন, ধর্ষকের এই ঔদ্ধত্যের মূল উৎস ছিলেন খোদ ইউপি চেয়ারম্যান। একজন ১১ বছরের অবুঝ শিশুকে নির্যাতনকারীকে আশ্রয় দেওয়া, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধকে টাকার জোরে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করায় শুধু ধর্ষকের ফাঁসিই নয়, বরং সহযোগী ও তথ্য গোপনকারী হিসেবে উক্ত ইউপি চেয়ারম্যান শওকত আলীকেও দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সাধারণ জনগণ।