
মামুনুর রশীদ মামুন : পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার মধ্যেই ময়মনসিংহে প্রকাশ্যে পরিবহন থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে চারজনকে গ্রেফতারের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে সড়কপথে সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজি সিন্ডিকেটের বিস্তৃতি ও নেপথ্যের প্রভাবশালীদের প্রশ্ন। ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্রে জানা গেছে, জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসানের দিকনির্দেশনায় ঈদযাত্রাকে নির্বিঘ্ন,যানজটমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে জেলার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বিশেষ নজরদারি ও টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৬ মে দিবাগত রাত আনুমানিক ১১টা ৩০ মিনিটে ময়মনসিংহের পাটগুদাম ব্রিজ এলাকায় টহলরত অবস্থায় বিভিন্ন যানবাহন থেকে অসাধুভাবে টাকা উত্তোলনের সময় চারজনকে হাতেনাতে আটক করে ডিবি পুলিশ। পরে তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন—
১. মো: ফরিদ মিয়া (২১)
২. মো: রুবেল
৩. মোহাম্মদ মোজাম্মেল (৩৫)
৪. মো: ইসমাইল (২১)
পুলিশের দাবি, ঈদকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ ও যাত্রীদের দুর্ভোগকে পুঁজি করে একটি চক্র বিভিন্ন পরিবহন থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করছিল। ডিবি পুলিশের তাৎক্ষণিক অভিযানে অন্তত ওই চক্রের চার সদস্যকে আটক করা সম্ভব হয়েছে। তবে ঘটনাটি সামনে আসার পর স্থানীয় পরিবহন সংশ্লিষ্ট মহল,সচেতন নাগরিক সমাজ এবং স্বাধীনচেতা বিভিন্ন মহলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে—শুধু মাঠপর্যায়ের চাঁদাবাজদের গ্রেফতার করলেই কি সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে? ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সড়কে প্রকাশ্যে চাঁদা আদায় কোনো বিচ্ছিন্ন বা একদিনের ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় সংঘবদ্ধভাবে এ ধরনের অপকর্ম চলে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে কথিত “লাইন ম্যানেজমেন্ট”, “টার্মিনাল খরচ”, “শ্রমিক ফান্ড” কিংবা অন্যান্য নামে পরিবহন থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, যারা মাঠে দাঁড়িয়ে টাকা তোলে তারা অনেক সময়ই কেবল “হুকুমের গোলাম” বা নিচুতলার কর্মী। কিন্তু তাদের পেছনে কারা রয়েছে,কার নির্দেশে এসব অর্থ আদায় হয়, কার কাছে সেই টাকা পৌঁছে—সেই প্রশ্নের উত্তর অধিকাংশ সময়ই অজানাই থেকে যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন,যদি প্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাব,তদবির ও অদৃশ্য চাপমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে তদন্ত পরিচালনার সুযোগ পায়, তাহলে শুধু চুনোপুঁটি নয়—এই চাঁদাবাজি চক্রের মূল হোতা,অর্থদাতা ও গডফাদারদেরও আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।বসচেতন মহলের অভিমত,দেশের মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে পরিবহন খাতকে কেন্দ্র করে যে অনিয়ম ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা ভাঙতে হলে দৃষ্টান্তমূলক ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু দুই-চারজনকে গ্রেফতার করে কয়েকদিন অভিযান চালিয়ে থেমে গেলে পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন হয় না; বরং কিছুদিন পর আবারও নতুন নামে,নতুন পরিচয়ে একই চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, প্রশাসনের কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থান অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপকর্মে জড়ানোর আগে অন্তত “দশবার ভাববে”। কারণ আইনের কঠোর প্রয়োগ ও নেপথ্যের শক্তিশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণই পারে সড়কে চাঁদাবাজির মতো অপরাধ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে। এদিকে, ডিবি পুলিশের সাম্প্রতিক অভিযানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সাধারণ মানুষ। তারা বলছেন, ঈদযাত্রায় মানুষের নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান আরও জোরদার হওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এই চক্রের পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগুলোর পরিচয়ও প্রকাশ করা জরুরি। কারণ জনমনে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—যারা সড়কে দাঁড়িয়ে টাকা তুলছিল তারা অপরাধী বটে, কিন্তু যাদের নির্দেশে এবং যাদের স্বার্থে এসব চাঁদাবাজি চলছিল–সেই গডফাদাররা আসলে কারা?