
বিল্লাল হোসেন মানিক :
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখার আওতায় জেলার ভূমি ও রাজস্ব প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালিত হলেও বিভিন্ন ভূমি অফিসে ঘুষ, হয়রানি ও অনিয়মের অভিযোগে সেবার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ না করলে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিচতলার ১২০ ও ১২১ নম্বর কক্ষে অবস্থিত রাজস্ব শাখা (এসএ শাখা) থেকে ভূমি ব্যবস্থাপনা, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়, সার্টিফিকেট মামলা নিষ্পত্তিসহ ভূমি প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
রাজস্ব শাখা সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ জেলায় ১৩টি উপজেলা ভূমি অফিস এবং ১৪৪টি ইউনিয়ন ও পৌর ভূমি অফিস রয়েছে। জেলার মোট মৌজার সংখ্যা ২ হাজার ২০০। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আজিম উদ্দিন জানান, ভূমি উন্নয়ন কর বাবদ প্রতি মাসে প্রায় দেড় কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হচ্ছে। বছরে প্রায় ১৮ কোটি টাকা।
তবে ভূমি অফিসগুলোতে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত অর্থ প্রদান না করলে ফাইলের কার্যক্রম দীর্ঘসূত্রতায় ফেলে রাখা হয় এবং সেবা প্রদানে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন ভূমি অফিসে গিয়ে নয়টি স্থানে ঘুষ গ্রহণের ভিডিওচিত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। ঘুষ গ্রহনের অভিযোগের ভিত্তিতে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুর রহমানসহ ৫ জন ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পৃথক দুটি অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। জনস্বার্থে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন এডভোকেট আজিজুল হক নামের এক ব্যক্তি। তিনি অভিযোগে উল্লেখ করেছেন ডিসি যোগদানের পর বিভিন্ন খাত থেকে প্রায় ১১ কোটি টাকা দুর্নীতি করে ময়মনসিংহ থেকে পাচার করেছেন। তিনি রাজধানীতে দুটি ফ্ল্যাট ও নিজ বাড়ি রংপুরে কয়েক একর জমি কিনেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে এক কর্মকর্তার নিজ জেলা রংপুর এবং তার পূর্ববর্তী কর্মস্থলেও তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী দল। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
রাজস্ব শাখার তথ্যমতে, জেলায় কানুনগো (এসএ/এলএসহ) পদ রয়েছে ২০টি। ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার ১৪৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১১৫ জন। ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তার ১৪৫টি পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৩৫ জন।
এছাড়া সার্ভেয়ারের ২৭টি পদের মধ্যে ২৫ জন, নাজির কাম ক্যাশিয়ারের ১৩টির মধ্যে ১০ জন, মিউটেশন সহকারীর ১২টির মধ্যে ৯ জন, সার্টিফিকেট সহকারীর ১৩টির মধ্যে ১১ জন এবং সার্টিফিকেট পেশকারের ১৩টির মধ্যে ১২ জন কর্মরত রয়েছেন।
চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য মঞ্জুরিকৃত ৪১৮টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ২৪২ জন। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের জনবল সংকট ভূমি প্রশাসনের কার্যক্রমে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং সেবা প্রদান ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে জেলার বিভিন্ন ভূমি অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ স্থানীয়ভাবে আলোচিত হলেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়।
এঘটনায় ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুর রহমানের বক্তব্য নিতে তার কার্যালয়ে দুইবার গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। সরকারি নাম্বারে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, ভূমি প্রশাসনে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে এবং ভূমি সেবা আরও স্বচ্ছ, গতিশীল ও জনবান্ধব হবে।