
মোহাম্মদ সবুর শেখ, চুকনগর (খুলনা) থেকে ফিরে।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজারের মেসার্স আরাফাত মৎস্য আড়তের স্বত্বাধিকারী ও সফল মৎস্য ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান শখের বশে বিলুপ্তপ্রায় ও দৃষ্টিনন্দন পরিযায়ী (purple Swamphen)কালিম (কালকুচ) পাখি পালন করে এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। সাধারণত হাওর-বিল ও জলাভূমিতে বসবাসকারী এই বুনো পাখিকে খাঁচায় বন্দি না রেখে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত পরিবেশে পোষ মানিয়ে পালন করায় প্রতিদিনই তার খামারে ভিড় করছেন স্থানীয় ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা উৎসুক দর্শনার্থীরা।
শখ থেকে সম্ভাবনার গল্প
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে মাছের ব্যবসার পাশাপাশি দেশীয় ও সৌখিন পাখি পালনে আগ্রহী ছিলেন আনিসুর রহমান। প্রায় এক বছর আগে তিনি শখের বশে এক জোড়া কালিম পাখির ছানা সংগ্রহ করেন। প্রথম দিকে পাখি দুটি বুনো স্বভাবের হলেও নিবিড় পরিচর্যা, সুষম খাদ্য ও আন্তরিক যত্নে অল্প সময়ের মধ্যেই গৃহপালিত হয়ে ওঠে।
বর্তমানে পাখি দুটি চুকনগর বাজার সংলগ্ন তার নিজস্ব খামার ও মৎস্যঘেরের আশপাশে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত পরিবেশে বিচরণ করে। মালিকের ডাক শুনলেই তারা কাছে চলে আসে, যা দর্শনার্থীদের বিস্মিত করছে।
দৃষ্টিনন্দন রূপ, সহজ লালন-পালন
নীল ও বেগুনি রঙের মনোমুগ্ধকর মিশ্রণে কালিম পাখির সৌন্দর্য সহজেই নজর কাড়ে। এর পা ও ঠোঁট উজ্জ্বল লাল রঙের। খামারি আনিসুর রহমান জানান, এদের পালন তুলনামূলক সহজ। জলজ উদ্ভিদ, কচি ঘাস, ধানের শীষ, ব্রয়লার ফিড, গম, ছোট মাছ ও চিংড়ি এদের প্রধান খাদ্য। গৃহপালিত হাঁসের মতোই এদের রোগবালাই কম এবং দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে।
দর্শনার্থীদের আগ্রহ
স্থানীয়দের ভাষ্য, এক সময় খুলনার বিল ডাকাতিয়াসহ বিভিন্ন জলাভূমিতে প্রচুর কালিম পাখি দেখা যেত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস এবং অবাধ শিকারের কারণে বর্তমানে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে চুকনগরে উন্মুক্ত পরিবেশে এমন বিরল পাখি দেখে অনেকেই মুগ্ধ হচ্ছেন। অনেকেই আনিসুর রহমানের এই উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেরাও কালিম পাখি পালনের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন।
বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
মৎস্য ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান বলেন,
“প্রথমে শুধু শখের বশে শুরু করেছিলাম। এখন এটিকে বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছি। কালিম পাখি অত্যন্ত বুদ্ধিমান। সঠিক পরিচর্যা করলে খুব সহজেই পোষ মানে। আমার এখানে তারা সম্পূর্ণ মুক্ত পরিবেশে বেড়ে উঠছে। আশা করছি শিগগিরই ডিম দেবে এবং বাচ্চা ফুটে এদের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে।”
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার মতামত
ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আশরাফুল কবির বলেন, স্থানীয় পরিবেশবাদীরা এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন মেনে এবং প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমতি নিশ্চিত করে যদি এ ধরনের বিরল প্রজাতির পাখির কৃত্রিম প্রজনন ও খামার গড়ে তোলা যায়, তাহলে তা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি এটি সৌখিন পাখিপ্রেমী ও উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন আয়ের ক্ষেত্রও সৃষ্টি করতে পারে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে একটি বিষয় যাচাই করা ভালো হবে—কালিম (Purple Swamphen) পাখি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের আওতাভুক্ত হতে পারে। তাই পাখিগুলো বৈধভাবে সংগ্রহ ও পালনের অনুমতির বিষয়টি নিশ্চিত করা থাকলে প্রতিবেদনটি আরও নির্ভুল ও শক্তিশালী হবে।