
নিজস্ব প্রতিবেদক:মো সোহেল
জাতীয় নিরাপত্তা, সংকটকালীন ব্যবস্থাপনা এবং তৃণমূল পর্যায়ে জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর বহুমুখী কৌশলগত অবদান এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। মিরপুর সেনানিবাসের মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ (DSCSC)-এর আমন্ত্রণে আয়োজিত এক বিশেষ উপস্থাপনায় বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ, এসজিপি, বিএএম, এনডিইউ, এএফডব্লিউসি, পিএসসি শান্তি ও যুদ্ধাবস্থায় বাহিনীর ঐতিহাসিক ও অপারেশনাল ভূমিকা অত্যন্ত সুচারুভাবে তুলে ধরেছেন।
আজ ২১ জুলাই ২০২৫ তারিখে ডিএসসিএসসি-এর চলমান স্টাফ কোর্সে অংশগ্রহণকারী চৌকস অফিসারদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত এই গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থাপনা ছিল না; বরং এটি ছিল জাতীয় প্রতিরক্ষা ও রাষ্ট্রগঠনে এক বিশাল তৃণমূল শক্তির সুবিন্যস্ত রূপরেখা। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকর্তাসহ সর্বমোট ৩৫৩ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন: ভাষা আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ
উপস্থাপনার শুরুতেই মহাপরিচালক বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর গৌরবময় ও রক্তস্নাত ইতিহাস গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বাহিনীর অকুতোভয় বীর সেনানীদের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জনে আনসার বাহিনীর সদস্যরা যে সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন, তা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। স্বাধীনতা-উত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা ও জনকল্যাণে বাহিনীটি এক অবিচল আস্থার প্রতীক হিসেবে কাজ করে চলেছে।
শান্তি ও যুদ্ধকালীন কৌশলগত মোতায়েন পরিকল্পনা
বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণের কথা মাথায় রেখে মহাপরিচালক শান্তিকালীন ও যুদ্ধকালীন উভয় পরিস্থিতিতেই আনসার ও ভিডিপির বিভিন্ন স্তরের সদস্যদের সুনির্দিষ্ট মোতায়েন পরিকল্পনা, সুদূরপ্রসারী দায়িত্ব এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের বিশদ বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি বাহিনীর সুদৃঢ় সাংগঠনিক কাঠামো, অপারেশনাল সক্ষমতা, বর্তমান সময়ের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ এবং আগামী দিনের দূরদর্শী ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিষয়ে অংশগ্রহণকারী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মকর্তাদের সামনে একটি স্পষ্ট ও তথ্যসমৃদ্ধ চিত্র উপস্থাপন করেন।
“দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও কৌশলগত স্থাপনার সুরক্ষা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ সংরক্ষণ, দুর্যোগ মোকাবিলা, নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ প্রতিটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী পেশাদারিত্বের এক অনন্য মানদণ্ড স্থাপন করেছে।”
— মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ
তৃণমূলের শক্তি ও মানবিক জনকল্যাণমুখী সাংবাদিকতা
একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি নিহিত থাকে তার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুশাসনের ওপর। দীর্ঘ অনুসন্ধানী পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত বিস্তৃত সুবিশাল সদস্যভিত্তিক এই বাহিনী জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সহায়ক শক্তি হিসেবে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং অপরাধ দমনে এই বাহিনীর মানবিক ও নিবেদিতপ্রাণ ভূমিকা সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
অনুষ্ঠান শেষে এক প্রাণবন্ত ও তথ্যবহুল উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে কোর্সে অংশগ্রহণকারী দেশি-বিদেশি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা বিভিন্ন কৌশলগত বিষয়ে প্রশ্ন করেন এবং মহাপরিচালক অত্যন্ত সাবলীল ও তত্ত্বভিত্তিক উত্তর দিয়ে তাদের সন্তুষ্ট করেন। এই যুগান্তকারী উপস্থাপনার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তারা শান্তি ও যুদ্ধাবস্থায় জাতীয় নিরাপত্তায় আনসার ও ভিডিপির কৌশলগত গুরুত্ব সম্পর্কে নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত ধারণা লাভ করেন।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তিলগ্নে কোর্সে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে মহাপরিচালককে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয়। আন্তর্জাতিক মানের মানদণ্ড এবং সর্বোচ্চ আইনি সুরক্ষা ও বস্তুনিষ্ঠতার সীমার ভেতরে থেকে এই সংবাদটি জাতির সামনে উপস্থাপন করা হলো।