
নিজেস্ব প্রতিবেদক
মানুষ বড়ই বিচিত্র। আরও বিচিত্র মানুষের জীবন। সবাই মানুষ হিসেবে জন্ম নিলেও কারও মুখে সোনার চামচ, আবার কারও ভাগ্যে জোটে ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট।
পরিবেশ—হ্যাঁ, পরিবেশই একজন মানুষের ভবিষ্যৎ ও অবস্থান অনেকটা নির্ধারণ করে। স্বাবলম্বী পরিবারের কেউ সহজেই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পায়, তার জন্য খুব বেশি সংগ্রাম করতে হয় না। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশকে পেছনে ফেলে যারা নিজেদের অবস্থান বদলে ফেলেন, তারাই একসময় ইতিহাস হয়ে যান। তেমনই অনেক মানুষ রয়েছেন, যারা দারিদ্র্য, ক্ষুধা আর অবহেলাকে তুচ্ছ করে নিজেদের মহিমান্বিত করেছেন। আজ তাদেরই একজনের গল্প বলব আপনাদের।
জন্ম তার ব্রাজিলের মোগি দাস ক্রুজেস শহরে। তিনি হয়ে উঠেছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। নাম তার—নেইমার।
হয়তো ব্রাজিল কিংবা নেইমার আপনার পছন্দের দল বা খেলোয়াড় নাও হতে পারে। কিন্তু তার জীবনসংগ্রাম জানলে আপনি অন্তত কিছুটা অনুপ্রাণিত হবেন।
“একদিন আমি অনেক ধনী হব। আমি একটা বিস্কুট কারখানা কিনব, যাতে যখন খুশি বিস্কুট খেতে পারি।”
এই কথাগুলো ছোটবেলায় নেইমার তার মাকে বলেছিলেন। দরিদ্র পরিবারের ছেলে নেইমার একদিন মায়ের কাছে বিস্কুট খেতে চেয়েছিল। কিন্তু তার মা না বলে দিয়েছিলেন। হয়তো সেদিন তার মায়ের থলিটাও ছিল শূন্য।
আমরা সবাই নানা ধরনের স্বপ্ন দেখি। ছোট্ট নেইমারের স্বপ্ন ছিল ধনী হয়ে একটি বিস্কুট কারখানা কেনা, যাতে ইচ্ছেমতো বিস্কুট খেতে পারে। পেটে ক্ষুধা থাকলে আকাশের চাঁদও রুটির মতো মনে হয়। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়ার আশাতেই হয়তো সে ফুটবলকে বেছে নিয়েছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটবল খেলেছে। ভালো ফুটবলার হওয়ার নেশা আর পরিবারের দারিদ্র্য ভুলে থাকার তাগিদ তাকে ডুবিয়ে রেখেছিল ফুটবলে।
মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি সান্তোস এফসি-এর একাডেমিতে যোগ দেন। তার অসাধারণ প্রতিভা দ্রুতই তাকে ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ তারকা হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
১৭ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবলে অভিষেকের পরই তিনি দারুণ সফলতা পান। এবার যেন তার স্বপ্ন সত্যি হওয়ার পালা। এরপর ২০১৩ সালে যোগ দেন এফসি বার্সেলোনায়।
কিন্তু জীবন কি এতই সহজ? জীবনের প্রতিটি ধাপেই আমাদের কঠিন কাঁটাতার পেরোতে হয়। ইউরোপের পরিবেশ, কৌশলগত চাপ এবং সমালোচনার কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন নেইমার। ড্রেসিং রুমের বাথরুমে একা বসে কেঁদেছেনও। এই কান্নাগুলো কি কেউ দেখে?
পরে লিওনেল মেসি এবং দানি আলভেসের সহযোগিতায় তিনি নিজেকে গুছিয়ে নেন। হয়ে ওঠেন কিংবদন্তি “এম এস এন” ত্রয়ীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
২০১৭ সালে নেইমার বিশ্বরেকর্ড €২২২ মিলিয়ন ট্রান্সফারে প্যারিস সেন্ট জার্মেইনে যোগ দেন। তিনি চেয়েছিলেন নিজের দলকে নেতৃত্ব দিতে। কিন্তু এখান থেকেই শুরু হয় তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সময়।
ফরাসি লিগে ডিফেন্ডারদের কঠোর ট্যাকলের কারণে তিনি বারবার গোড়ালি ও পায়ের হাড়ে গুরুতর ইনজুরিতে পড়েন। গুরুত্বপূর্ণ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ম্যাচের আগেই প্রায়শই মাঠের বাইরে থাকতে হতো তাকে। মিডিয়া তাকে “পার্টি বয়” হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে তিনি ভয়াবহ ট্যাকলের শিকার ছিলেন।
২০২৩-২৪ মৌসুমে নেইমার ভয়াবহ এসিএল এবং মেনিস্কাস ইনজুরিতে পড়েন। এই ইনজুরির কারণে তিনি ৩০০ দিনেরও বেশি সময় মাঠের বাইরে ছিলেন। এর আগেও ২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে খেলতে গিয়ে গুরুতর পিঠের ইনজুরিতে পড়েছিলেন, যা তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্তগুলোর একটি।
দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকার কারণে তিনি একাকীত্ব ও মানসিক কষ্টের সঙ্গে লড়াই করেছেন। তিনি স্বীকার করেছিলেন, মানুষ অনেক সময় ফুটবলারের পেছনের মানুষটাকে দেখে না। এমনকি অবসর নেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু তিনি হার মানেননি।
কঠিন পুনর্বাসনের পর ২০২৫ সালে আবেগঘনভাবে নিজের শিকড় সান্তোস এফসি-তে ফিরে যান। কয়েক দিন আগেই ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে নিজের নাম ঘোষণার পর তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে সেই কান্না ছিল আনন্দের—ফিরে আসার আনন্দ, লড়াই জিতে ফের দাঁড়ানোর আনন্দ।
নেইমারের বেশ কিছু রেকর্ড রয়েছে, যা তাকে বিশেষ খ্যাতি এনে দিয়েছে। ব্রাজিল জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের একজন তিনি। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি ট্রান্সফারের রেকর্ডও দীর্ঘদিন তার দখলে ছিল। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে শত শত গোল ও অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। অলিম্পিকে ব্রাজিলকে প্রথম ফুটবল স্বর্ণপদক জেতাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
আজ নেইমার অনেক টাকার মালিক। আজ তিনি চাইলে অনেক বিস্কুট কারখানা কিনতে পারেন। কারণ তার ছিল ইচ্ছাশক্তি, স্বপ্ন এবং অধ্যবসায়।
তিনি শুধু ফুটবলার নন, বিভিন্ন দাতব্য কাজের সঙ্গেও জড়িত। তার প্রতিষ্ঠিত “ইনস্টিটিউটো প্রোজেক্টো নেইমার জুনিয়র” দরিদ্র শিশু ও পরিবারদের শিক্ষা, খেলাধুলা, স্বাস্থ্যসেবা এবং খাবারের সহায়তা দিয়ে থাকে। এছাড়াও বিভিন্ন হাসপাতাল ও শিশু চিকিৎসা প্রকল্পে অনুদান দিয়েছেন তিনি। করোনা মহামারির সময়ও বিপুল অর্থ সহায়তা করেছিলেন।
অনেক সমালোচনা থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে নেইমার অসংখ্য মানুষের সাহায্য করেছেন, বিশেষ করে দরিদ্র শিশুদের জন্য নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন।
বারবার নেইমার ভেঙে পড়েছেন, আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। এটাই একজন সত্যিকারের যোদ্ধার পরিচয়।
আমাদের জীবনেও নানা বাধা আসবে। কিন্তু ইচ্ছাশক্তি আর অধ্যবসায় থাকলে আমরা হয়তো নেইমার হতে পারব না, কিন্তু নিজেদের পরিস্থিতি অবশ্যই বদলাতে পারব। হয়তো অন্য কারও জীবনও বদলে দিতে পারব।
বর্তমানে আবারও তার ইনজুরির খবর রয়েছে। তবুও আশা করি, বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমার আবারও মাঠ রাঙাবেন।