
আব্দুর রাজ্জাক গঙ্গাচড়া (রংপুর)
“প্রতিভা কোনো সীমাবদ্ধ সিদ্ধিতে সন্তুষ্ট থাকে না, অসন্তোষই তার জয়যাত্রার সারথি” – বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই অমর উক্তি যেন বাস্তব রূপ পেয়েছে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তারের কর্মকাণ্ডে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি হয়ে উঠেছেন উপজেলার উন্নয়ন, শৃঙ্খলা ও মানবিক প্রশাসনের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।
সরকারি দপ্তরে যেখানে জনভোগান্তি ও অভিযোগের কথা প্রায়ই শোনা যায়, সেখানে গঙ্গাচড়ায় ব্যতিক্রম এক পরিবেশ তৈরি করেছেন এই প্রশাসনিক কর্মকর্তা। সততা, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতার সমন্বয়ে তিনি পরিবর্তন এনেছেন পুরো উপজেলা প্রশাসনের চিত্রে।
২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ইউএনও জেসমিন আক্তার প্রশাসনিক কার্যক্রমে নতুন গতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে আসেন। উপজেলা পরিষদসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, সেবার মান বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হয়ে ওঠে তার প্রধান লক্ষ্য।
তার উদ্যোগে সরকারি-বেসরকারি দপ্তরগুলোতে সেবাদান প্রক্রিয়া সহজ হয়, কমে যায় সাধারণ মানুষের দৌড়ঝাঁপ ও ভোগান্তি। এখন গঙ্গাচড়ায় সেবা মানেই দ্রুত সমাধান ও স্বচ্ছতা – এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়রা।
ইউএনও জেসমিন আক্তারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কঠোর আইন প্রয়োগ। তিনি অভিযোগ পেলেই তা যাচাই করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ফেসবুক, ফোন কিংবা সরাসরি অভিযোগ—সব মাধ্যমেই তিনি সক্রিয়।
অবৈধ বালু উত্তোলন, মাটি কাটা, অতিরিক্ত দামে জ্বালানি বিক্রি কিংবা প্রশাসনিক অনিয়ম কোনো কিছুতেই তিনি ছাড় দেন না। প্রভাবশালী হোক বা সাধারণ মানুষ—আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান, এই নীতিতে তিনি অটল।
শিক্ষা খাতে তার ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসায় নিয়মিত পরিদর্শন এবং ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছেন তিনি। নকলমুক্ত পরীক্ষা নিশ্চিত করতে তার কঠোর নজরদারিতে এসএসসি পরীক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, এখন শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ও নিয়মিত পাঠদান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ডে তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত। অর্থ সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো, অসহায় পরিবারকে সহযোগিতা, কিংবা জরুরি চিকিৎসা সহায়তায় ভূমিকা রাখা,সব ক্ষেত্রেই তিনি মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী শাহানাজ আক্তারের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু একজন প্রশাসক নন, বরং একজন অভিভাবকের ভূমিকাও পালন করেছেন।
দুর্যোগকালীন সময়ে দ্রুত ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে তার সক্রিয় ভূমিকা স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়েছে। ভিজিএফ চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে তিনি প্রমাণ করেছেন,দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি কঠোর অবস্থানে।সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সরেজমিন তদারকি করে শতভাগ বাস্তবায়নের চেষ্টা তার প্রশাসনিক দক্ষতার আরেকটি দিক।
মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে তিনি ক্রীড়া কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়েছেন। উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার মাধ্যমে নিয়মিত টুর্নামেন্ট ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করে তরুণদের খেলাধুলায় যুক্ত করছেন। এতে করে তরুণ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে নিয়মিত পরিদর্শন, স্থানীয় সমস্যা সরাসরি শোনা এবং দ্রুত সমাধানের কারণে তিনি সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা তার ভূমিকার প্রশংসা করছেন। অনেকেই বলছেন, আগে যে সেবা পেতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো, এখন তা সহজ ও দ্রুত হয়েছে।
স্থানীয় নারী সেবা গ্রহীতা মোসা. নাসরিন বেগম বলেন,নারীদের জন্য প্রশাসনের কাছে যাওয়া আগে কঠিন ছিল। এখন সহজ হয়েছে, আমরা সরাসরি কথা বলতে পারি। গঙ্গাচড়ার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন,আগে সরকারি কাজে অনেক ঘুরতে হতো। এখন ইউএনও ম্যাডামের উদ্যোগে বেশিরভাগ কাজ দ্রুতই হয়ে যাচ্ছে।
সহশিক্ষক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ইউএনও মহোদয়ের নিয়মিত পরিদর্শনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। শিক্ষার পরিবেশ অনেক উন্নত হয়েছে। গঙ্গাচড়া সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আখের মিঞা বলেন, নকলমুক্ত পরীক্ষা ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীরা এখন বেশি মনোযোগী হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী শাহানাজ আক্তার বলেন, ইউএনও ম্যাডামের সহযোগিতায় আমার ভর্তি প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে। তিনি সত্যিই শিক্ষার্থীবান্ধব একজন প্রশাসক।
সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মাহফুজার রহমান ইসলাম দুলু বলেন, তার যোগদানের পর প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের গতি এসেছে।
লক্ষীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল হাদী বলেন, মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় এখন অনেক শক্তিশালী হয়েছে।
ইউএনও জেসমিন আক্তার বলেন, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আমাদের মূল দায়িত্ব জনগণের সেবা করা। আমি সবসময় চেষ্টা করি মানুষের সমস্যা দ্রুত সমাধান করতে এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করতে। তিনি আরও বলেন, যতদিন দায়িত্বে আছি, ততদিন গঙ্গাচড়ার উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাব। এজন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।