
স্টাফ রিপোর্টার | ঢাকা
ব্রিটিশ রাষ্ট্রনায়ক ও উদারনৈতিক রাজনীতিবিদ উইলিয়াম গ্লাডস্টোনের বিখ্যাত উক্তি— “Justice delayed is justice denied” অর্থাৎ, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা মানেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া। এই দর্শনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি আলোচিত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে জনগণের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মম হত্যার ঘটনায় মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৭ জুন ঢাকা মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আসামিদের উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন। বিচার বিশ্লেষকদের মতে, এটি বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার অন্যতম দ্রুততম নিষ্পত্তি, যা দেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে ঘটনার পর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচার বিভাগের পাশাপাশি সরকারের প্রতিও আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, নিহত শিশুর পরিবার, আইনজীবী মহল, মানবাধিকার কর্মী, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ এবং দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ।
এর আগে মাগুরার শিশু আছিয়া এবং মেহেরপুরের ৯ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোরও অল্প সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন হয়েছিল। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, প্রায় ১৪৪ বছর আগে ব্রিটিশ শাসনামলে নদীয়ার এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার শুরু হওয়ার দিনই রায় ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে স্বাধীন বাংলাদেশে পল্লবীর রামিসা হত্যা ও ধর্ষণ মামলার ১৯ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি অতীতের বহু রেকর্ড ভেঙে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত বিচার কেবল একটি মামলার নিষ্পত্তিই নয়; এটি অপরাধ দমনের কার্যকর হাতিয়ারও বটে। কারণ, অপরাধীরা যখন দেখে যে অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত তদন্ত, বিচার এবং শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে, তখন ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ করার প্রবণতা কমে আসে।
বর্তমান সময়ে প্রায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, সাইবার অপরাধ, মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক ঘটনার সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এসব ঘটনা সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, মূল্যবোধের সংকট এবং সামাজিক অস্থিরতার ইঙ্গিত বহন করছে। সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষার প্রশ্নও ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, মাদকাসক্তি, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং নৈতিক শিক্ষার অভাব অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে। ফলে শুধু আইন প্রয়োগ বা বিচারই নয়, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ধর্ষণ, হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা গেলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙবে এবং অপরাধীরা কঠোর বার্তা পাবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারও দ্রুত ন্যায়বিচার লাভ করবে, যা সামাজিক আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হবে।
দেশের সচেতন মহল মনে করছে, পল্লবীর রামিসা, মাগুরার আছিয়া, মেহেরপুরের শিশু এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের শিকার শিশুদের ঘটনাগুলো আমাদের সামাজিক বাস্তবতার কঠিন চিত্র তুলে ধরেছে। এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বিচার বিভাগের পাশাপাশি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং মানবিক মূল্যবোধ পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও সভ্য সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। দ্রুত বিচার প্রাপ্তির বর্তমান ধারা যদি ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকে, তাহলে বাংলাদেশের মানুষ আরও বেশি আস্থার সঙ্গে বিচার বিভাগের দিকে তাকাবে এবং একদিন সত্যিই “বিচারের বাণী আর নীরবে কাঁদবে না”।
লেখক: ড. মোহাম্মদ আবু তাহের
পরিচিতি: লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক