
আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রতিবেদন
বিশ্লেষণ ও কলাম: মো. সোহেল
উত্তাল লোহিত সাগর এবং ইতিহাসের নির্মম বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা হর্ন অব আফ্রিকা—এই দুই ভৌগোলিক প্রান্ত যেন বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতির এক অবরুদ্ধ আগ্নেয়গিরি। বৈশ্বিক বাণিজ্যের হৃৎস্পন্দন এই জলপথ ও তৎসংলগ্ন জনপদে আজ কূটনীতির টেবিলে চলছে এক জটিল ও রুদ্ধদ্বার ক্ষমতার লড়াই। প্রশ্ন জাগে, এই ভূ-কৌশলগত মহাসমুদ্রে শান্তির পায়রা ও সংঘাতের সলতে কে একসঙ্গে নাড়ছে? উত্তরটি কোনো একক মহাশক্তির হাতে বন্দি নয়, বরং এটি আঞ্চলিক পরাশক্তি, মধ্যপ্রাচ্যের অর্থবল এবং বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদী অক্ষের এক বহুমাত্রিক ও মচ্ছবপূর্ণ কূটচাল।
কূটনীতির মূল চালিকাশক্তি কারা?
এই অঞ্চলের ভাগ্য নির্ধারণে বর্তমানে তিন স্তরের কূটনৈতিক শক্তি সক্রিয় রয়েছে:
আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী ও সংস্থা: পূর্ব আফ্রিকা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (IGAD)-এর মতো আঞ্চলিক ফোরামগুলো প্রথাগত মধ্যস্থতার চেষ্টা চালালেও, কেনিয়া ও জিবুতির মতো রাষ্ট্রগুলো নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তাকে সুরক্ষিত রাখতে কূটনৈতিক দরকষাকষির ফ্রন্টলাইন তৈরি করেছে।
উপসাগরীয় অর্থনীতির নতুন মোড়ল: পেত্রোডলারের অফুরন্ত শক্তি নিয়ে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) লোহিত সাগরের দুই তীরকে নিজেদের বাণিজ্যিক ও সামরিক বলয়ে আনতে মরিয়া। বন্দর ইজারা, লজিস্টিক হাব এবং আর্থিক সহায়তার মুলা ঝুলিয়ে তারা এই অঞ্চলে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করছে।
বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর ত্রিমুখী টানাপোড়েন: যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটাভাস এই অঞ্চলকে উত্তপ্ত করে রেখেছে। বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইন খ্যাত এই রুটে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের ঠান্ডা লড়াই কূটনীতিকে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কেন এই মরিয়া কূটনীতি? নেপথ্যের হিসাব-নিকাশ
লোহিত সাগর ও হর্ন অব আফ্রিকার এই কূটনৈতিক তৎপরতা নিছক কোনো শান্তির অন্বেষণ নয়; এর পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী ভূ-কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ:
বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনী রক্ষা: এশিয়া ও ইউরোপকে সংযোগকারী সুয়েজ খাল এবং বাব-এল-মান্দেব প্রণালীর সামান্য বিঘ্ন মানেই বিশ্ব অর্থনীতিতে এক মহাবিপর্যয়। এই সামুদ্রিক রুট সচল রাখাই বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রধান কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা।
সাম্রাজ্যবাদী ও সামরিক প্রতিপত্তি: এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মিলনমেলা এই অঞ্চলে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি মজবুত করা এবং আকাশ ও সমুদ্রপথের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার এক গোপন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে বিশ্বশক্তিগুলো।
ভগ্নপ্রায় রাষ্ট্রগুলোর স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন: সুদান, সোমালিয়া ও ইথিওপিয়ার দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং চরমপন্থার বিস্তার সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে তুলেছে। শরণার্থী স্রোত ও সীমান্ত সন্ত্রাস রোধের বাধ্যবাধকতা থেকে এই কূটনীতি আজ অনিবার্য।
বন্দর অর্থনীতি ও খনিজ সম্পদের হাতছানি: লোহিত সাগরের তটরেখায় নতুন নতুন বন্দর নির্মাণ এবং লোভনীয় সামুদ্রিক বাণিজ্য চ্যানেলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কব্জায় নিতে উপসাগরীয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ এখন তুঙ্গে।
আইনি ও স্বত্বাধিকার নোটিশ: এই কলাম এবং বিশ্লেষণী প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার নীতিমালার আলোকেই প্রণীত। এর কোনো অংশ বা সমতুল্য বিষয়বস্তু অননুমোদিতভাবে বাণিজ্যিক বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা আইনত দণ্ডনীয় হতে পারে।