
অনুমতি ছাড়া হিসাব খোলার অভিযোগ, ১০ লাখের পর দ্বিতীয় দফায় ২ লাখ টাকা জমা ও স্থানান্তর; থানায় পুনরায় অভিযোগ।
প্রভাত ঘোষ নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
নারায়ণগঞ্জে সাংবাদিক মোঃ রায়হান আহমেদ ভূঁইয়ার নামে পূবালী ব্যাংক পিএলসির নিতাইগঞ্জ শাখায় খোলা একটি ব্যাংক হিসাবকে কেন্দ্র করে ১২ লাখ টাকার লেনদেন নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, নিজের অনুমতি ছাড়াই তাঁর নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। ওই হিসাবে প্রথমে ১০ লাখ টাকা এবং পরবর্তী সময়ে আরও ২ লাখ টাকা জমা হয়। এসব অর্থ কীভাবে জমা হলো, কোথায় স্থানান্তরিত হলো এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কী ভূমিকা পালন করেছেন—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
রায়হান আহমেদ ভূঁইয়া একজন সাংবাদিক। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেও তিনি হিসাব খোলা ও অর্থ লেনদেনের বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাননি। এ ঘটনায় তিনি ২০২৫ সালে পুলিশকে অবহিত করার পাশাপাশি সম্প্রতি নতুন লেনদেনের বিষয়টি উল্লেখ করে আবারও অভিযোগ করেছেন।
প্রথমে ১০ লাখ টাকা জমার এসএমএস
রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৬ মে তাঁর মোবাইল ফোনে পূবালী ব্যাংকের ভৈরব শাখা থেকে তাঁর নামে থাকা একটি হিসাবে ১০ লাখ টাকা জমার এসএমএস আসে। অথচ তিনি দাবি করেন, পূবালী ব্যাংকে তিনি নিজে কোনো হিসাব খোলেননি এবং কাউকে তাঁর নামে হিসাব খোলার অনুমতিও দেননি।
বিষয়টি জানার পর তিনি ব্যাংকের টানবাজার ও নিতাইগঞ্জ শাখায় যোগাযোগ করেন। তাঁর অভিযোগ, নিতাইগঞ্জ শাখার হেল্প ডেস্কে দায়িত্ব পালনকারী পিয়াংকা তাঁকে জানান, ভুলবশত অন্যের টাকা ওই হিসাবে জমা হয়েছিল এবং পরে তা ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁর নামে হিসাব খোলা এবং তাঁকে না জানিয়ে টাকা স্থানান্তরের বিষয়ে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাননি বলে দাবি করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ব্যাংকের অপারেশন ম্যানেজার মনিরের কাছে লেনদেনের বিস্তারিত জানতে চাইলে প্রয়োজনীয় তথ্য পাননি। পরে শাখা ব্যবস্থাপক শফিউল আজমের কাছ থেকে একটি লেনদেন বিবরণী পেলেও তাতে ব্যাংকের সিল ও স্বাক্ষর ছিল না বলে তাঁর দাবি।
জিডি ও পুলিশ সুপার বরাবর অভিযোগ
এ ঘটনায় রায়হান আহমেদ ভূঁইয়া ১৮ মে ২০২৫ তারিখে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে ২৪ জুলাই ২০২৫ তারিখে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগও দেন। তাঁর দাবি, দীর্ঘ সময় পার হলেও হিসাবটি কে খুলেছেন, কারা এর মাধ্যমে লেনদেন করেছেন এবং অর্থ কোথায় স্থানান্তরিত হয়েছে—এসব বিষয়ে তিনি এখনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাননি।
নতুন করে ২ লাখ টাকা জমা, পরে স্থানান্তরের অভিযোগ
রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে তাঁর মোবাইল ফোনে পূবালী ব্যাংকের ভৈরব শাখা থেকে একই হিসাবে আরও ২ লাখ টাকা জমার এসএমএস আসে। বিষয়টি জানার পর তিনি নিতাইগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক শফিউল আজমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ব্যাংকে গিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, ওই দিন শাখায় অবস্থানকালে ব্যবস্থাপক তাঁর কক্ষ থেকে কাউন্টারের দিকে যান এবং ফিরে আসার পরপরই তাঁর হিসাবে জমা হওয়া ২ লাখ টাকা অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। টাকা কোন হিসাবে পাঠানো হয়েছে, সে বিষয়ে তাঁকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
৩ নভেম্বর ব্যাংকে বাবা-ছেলের উপস্থিতি, হিসাব বন্ধের কথা জানান ব্যবস্থাপক
রায়হান আহমেদ ভূঁইয়া জানান, গত ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে তিনি তাঁর বাবাকে সঙ্গে নিয়ে আবারও পূবালী ব্যাংকের নিতাইগঞ্জ শাখায় যান। সেখানে শাখা ব্যবস্থাপক শফিউল আজম তাঁদের জানান, তাঁর নামে থাকা অনলাইন ব্যাংক হিসাবটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে ভুলবশত ওই হিসাবে আর কেউ টাকা পাঠাতে না পারেন।
এ সময় রায়হান ব্যবস্থাপককে প্রশ্ন করেন, ২০২৫ সালে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নিয়ে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে হিসাব বন্ধ করার জন্য তাঁর স্বাক্ষর চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তখনও বলেছিলেন, যে হিসাব তিনি নিজে খোলেননি, সেটি বন্ধ করতে তিনি কেন স্বাক্ষর দেবেন?
রায়হানের প্রশ্ন, এত দিন হিসাবটি চালু থাকার পর দ্বিতীয় দফায় ২ লাখ টাকা জমা ও স্থানান্তরের ঘটনার পর তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে না জানিয়ে অনলাইন হিসাব বন্ধ করা হলো কেন? তাঁর দাবি, এ বিষয়ে ব্যবস্থাপকের কাছে ব্যাখ্যা চাইলেও তিনি কোনো সুস্পষ্ট উত্তর পাননি। পুরো কথোপকথনের রেকর্ড তাঁর কাছে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ব্যবস্থাপকের কাছে লিখিত দরখাস্ত
৩ নভেম্বর শাখা ব্যবস্থাপক শফিউল আজমের বরাবর একটি লিখিত দরখাস্ত জমা দিয়েছেন বলে জানান রায়হান আহমেদ ভূঁইয়া। এতে ১০ লাখ ও ২ লাখ টাকা কীভাবে তাঁর নামে থাকা হিসাবে জমা হলো, কারা টাকা পাঠিয়েছেন, পরবর্তী সময়ে অর্থ কোথায় স্থানান্তরিত হয়েছে এবং তাঁর অনুমতি ছাড়া হিসাব খোলার ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা কী—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছেন তিনি।
একই সঙ্গে হিসাব খোলার আবেদনপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র-সংক্রান্ত তথ্য, স্বাক্ষর, কেওয়াইসি নথি, লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণী এবং অর্থ গ্রহণকারী হিসাবের তথ্য যাচাই করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
রায়হানের অভিযোগ, একটি ব্যাংক শাখার প্রধান হিসেবে ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব ছিল বিষয়টি স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা এবং হিসাব-সংক্রান্ত অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু একাধিকবার যোগাযোগের পরও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না পাওয়ায় তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এম. এ. গাফফারের মন্তব্য নিয়েও প্রশ্ন
রায়হান আহমেদ ভূঁইয়া জানান, ব্যাংকের সাবেক কর্মী এম. এ. গাফফারের সঙ্গে এ বিষয়ে তাঁর কথা হয়েছিল। ওই কথোপকথনে ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রসঙ্গ উঠলে গাফফার তাঁকে বলেন, “ব্যাংকের সঙ্গে কীভাবে পারা যায়?”—এমন বক্তব্যের কথা জানিয়েছেন রায়হান।
তাঁর দাবি, এ মন্তব্যের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের ক্ষেত্রে ব্যাংকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া কতটা কঠিন, সে বিষয়ে তাঁকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। ওই কথোপকথনের ভিডিও তাঁর কাছে রয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে বক্তব্যটির পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নতুন লেনদেনের বিষয়ে সদর মডেল থানায় পুনরায় অভিযোগ
নতুন করে ২ লাখ টাকা জমা ও স্থানান্তরের অভিযোগের পর গত ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় পুনরায় লিখিত অভিযোগ করেছেন সাংবাদিক মোঃ রায়হান আহমেদ ভূঁইয়া। তিনি জানান, নতুন অভিযোগে ২০২৫ সালের পূর্ববর্তী ঘটনাবলির পাশাপাশি সর্বশেষ লেনদেনের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন।
রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার তদন্ত কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলাম বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছেন। এখন তদন্তের মাধ্যমে হিসাবটি কীভাবে খোলা হয়েছিল, অর্থ কোথায় স্থানান্তরিত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল—তা উদ্ঘাটনের প্রত্যাশা করছেন তিনি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
সাংবাদিক রায়হান আহমেদ ভূঁইয়া দাবি করেন, তাঁর নামে ব্যাংক হিসাব খোলার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ১০ লাখ ও ২ লাখ টাকার লেনদেন, অর্থ স্থানান্তর এবং পরে অনলাইন হিসাব বন্ধ করার পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। কারা হিসাব খুলেছেন, কারা লেনদেন করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন কি না—তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।