
শামিম বেপারী সাভার আশুলিয়া
সরকারি দপ্তরে সাধারণ মানুষের হয়রানিমুক্ত ও স্বচ্ছ সেবা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ঢাকার সাভার রাজস্ব সার্কেলের অধীন আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে এর ব্যতিক্রম চিত্রের অভিযোগ উঠেছে। নামজারি, খারিজ ও খাজনা সংক্রান্ত সেবা নিতে এসে অতিরিক্ত অর্থ দাবি, বহিরাগতদের দাপট এবং দাপ্তরিক কাজে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছে সরকারি এই কার্যালয়ের কার্যক্রম।
স্থানীয় ও সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, শিমুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে স্বপন ও কাউসার নামে দুই ব্যক্তি নিয়মিতভাবে অবস্থান করেন। তাদের মধ্যে কাউসারকে ভূমি কর্মকর্তার কার্যালয়ের পাশের কক্ষে বসে সরকারি নথিপত্র ও ল্যাপটপ ব্যবহার করে দাপ্তরিক কাজ করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে—স্বপন ও কাউসার আসলে কারা? তারা কি ভূমি মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদিত কোনো কর্মচারী কিংবা সনদপ্রাপ্ত ব্যক্তি? সরকারি পদে না থাকলে তারা কীভাবে ভূমি অফিসের অভ্যন্তরে বসে নামজারি, খারিজ ও ভূমি-সংক্রান্ত সংবেদনশীল কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছেন—এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে শিমুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা নাসির খানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, স্বপন ও কাউসার নামে কাউকে তিনি চেনেন না। তবে তাঁর কার্যালয়ের ভেতরে বহিরাগতদের নিয়মিত অবস্থান ও দাপ্তরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিযোগ থাকায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সেবাপ্রার্থীদের কয়েকজনের অভিযোগ, নামজারি ও খারিজের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করে দেওয়ার কথা বলে সরকারি ফির বাইরে ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ দাবির অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, কাউসারকে কেন্দ্র করে একাধিক ব্যক্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছেন। তারা সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে কাগজপত্র সংগ্রহ, নামজারি, খাজনা ও খারিজের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, কাউসারের সঙ্গে চার থেকে পাঁচজন ব্যক্তি নিয়মিতভাবে ভূমি অফিসের বিভিন্ন কাজে সক্রিয়। তাদের ভূমিকা কী, তারা কোনো সরকারি অনুমোদনের আওতায় কাজ করেন কি না এবং সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ লেনদেনের সঙ্গে তারা জড়িত কি না—তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
কাউসারকে ঘিরে স্থানীয়দের অভিযোগের পাশাপাশি নায়েব নাসিরের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার বিষয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, কাউসারের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
এমনকি স্থানীয় পর্যায়ে এমন কথাও ছড়িয়েছে যে, নায়েব নাসিরকে শিমুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করে আনার পেছনে কাউসারের ভূমিকা ছিল এবং এ জন্য ৬ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রামাণ্য নথি বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিছক গুঞ্জন, নাকি এর পেছনে বাস্তব কোনো ঘটনা রয়েছে—তা যাচাই করা জরুরি।
শিমুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, নামজারি ও খারিজের আবেদন, সরকারি রাজস্ব জমার হিসাব, অনলাইন কার্যক্রমের লগ ও সংশ্লিষ্ট আইডি, অফিসে নিয়মিত অবস্থানকারী ব্যক্তিদের পরিচয় এবং তাদের দায়িত্বের বিষয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
একই সঙ্গে সরকারি দপ্তরের ভেতরে বহিরাগত কেউ নিয়মিতভাবে দাপ্তরিক নথি বা কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে থাকলে, তিনি কী অনুমোদনে তা করছেন—সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
অভিযোগগুলো সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
শিমুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে সাভার উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিরপেক্ষ তদন্তে এগিয়ে আসে কি না—এখন সেটিই দেখার বিষয়। তদন্ত হলে বহিরাগতদের প্রকৃত ভূমিকা, অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এবং ‘নায়েব নাসিরের খুঁটির জোর’ নিয়ে ওঠা প্রশ্নেরও জবাব মিলতে পারে।