
মঈনউদ্দিন মনি, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
বাংলাদেশের প্রধান এবং অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন নগরী হিসাবে শীতের শুরুতে কক্সবাজারে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের ঢল নামতে শুরু করেছে। কক্সবাজারকে বলা হয় দেশের অন্যতম সেরা স্বাস্থ্যকর স্থান। বছরের প্রতিটি ঋতুতেই লাখ লাখ মানুষ সপরিবারে এখানে ছুটি কাটাতে এবং ক্লান্তি দূর করতে ছুটে আসেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটকদের এই প্রিয় গন্তব্যের সার্বিক নিরাপত্তা ও আবাসন খাতের অব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পর্যটকদের অভিযোগ, কক্সবাজারে আগের সেই চিরচেনা নিরাপদ পরিবেশ এখন আর নেই।
সরেজমিনে এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার জুড়ে পর্যটকদের আবাসন সুবিধার জন্য শত শত হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট এবং গেস্ট হাউস গড়ে উঠেছে। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, এর একটি বড় অংশই সরকারি কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ব্যাঙের ছাতার মতো যেখানে-সেখানে গড়ে উঠেছে। অনেক ব্যবসায়ী কেবল নিজেদের অতিরিক্ত ফায়দা বা মুনাফা লোটার উদ্দেশ্যে অপরিকল্পিতভাবে এসব স্থাপনা পরিচালনা করছেন। পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কিংবা জরুরি বহির্গমন পথ ছাড়াই এসব হোটেল ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, যা পর্যটকদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নিরাপত্তা ও নিয়ম না মানার এই চরম উদাসীনতার ফল হিসেবে সম্প্রতি কক্সবাজারের দু-একটি স্থানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব অগ্নিকাণ্ডে ভবনে আটকে পড়ে বেশ কয়েকজন পর্যটক ও সাধারণ মানুষ পুড়ে মারা গেছেন। এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু এবং দুর্ঘটনা কক্সবাজারের ভাবমূর্তি দেশ-বিদেশে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। ফলে, সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—”স্বাস্থ্যকর এই স্থানটি কি সত্যিই আর নিরাপদ আছে?”
কক্সবাজারের গৌরব ফিরিয়ে আনতে এবং এই স্বাস্থ্যকর স্থানটিকে একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে অবিলম্বে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহল। এর মধ্যে অন্যতম হলো সরকারি নিয়মনীতি না মেনে যত্রতত্র গড়ে ওঠা লাইসেন্সবিহীন হোটেল ও মোটেলগুলোর বিরুদ্ধে অবিলম্বে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করা। পাশাপাশি প্রতিটি বাণিজ্যিক ভবনে ফায়ার ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা, নিয়মিত মহড়া ও আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং বহুতল হোটেলগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে পর্যাপ্ত ও উন্মুক্ত জরুরি বহির্গমন (Emergency Exit) পথ রাখতে হবে। পর্যটকদের সার্বিক সুরক্ষায় সৈকত ও হোটেল জোনসহ প্রধান প্রধান স্থানগুলোতে ২৪ ঘণ্টা ট্যুরিস্ট পুলিশের টহল ও নিরাপত্তা চৌকি বাড়ানো এবং পুরো পর্যটন এলাকা ও প্রতিটি হোটেলের চারপাশ ও করিডোর বাধ্যতামূলকভাবে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় এনে তা কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। এছাড়া পর্যটকরা যাতে কোনো ধরনের প্রতারণার শিকার না হন, সেজন্য হোটেল রুমের ভাড়া, খাবার এবং অন্যান্য সেবার মূল্য সরকারিভাবে নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। হোটেল-মোটেলে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আচরণগত প্রশিক্ষণ দেওয়া ও তাদের অপরাধমূলক রেকর্ড আছে কিনা তা যাচাইয়ের জন্য ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করা যেমন জরুরি, তেমনই প্রতি ছয় মাস পর পর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মাধ্যমে প্রতিটি হোটেলের ফায়ার অডিট চালুকরণ আবশ্যক। পর্যটকদের যেকোনো সমস্যায় তাৎক্ষণিক সহায়তার জন্য সুনির্দিষ্ট এবং সার্বক্ষণিক হেল্পলাইন বুথ চালু রাখার পাশাপাশি যেসকল হোটেল মালিক সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে ব্যবসা পরিচালনা করছে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তির ব্যবস্থা করে আইন অমান্যকারীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
শীতের শুরুতে কক্সবাজারে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের ঢল নামতে শুরু করেছে। পর্যটকদের ভ্রমণ নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে বিশেষ প্রস্তুতি ও কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশ। প্রধান সৈকতসমূহ (লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী, ইনানী) ও মেরিন ড্রাইভে ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশ ও স্পেশাল রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন যৌথভাবে ২৪ ঘণ্টা মোবাইল টহল ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে। পর্যটকদের সুবিধার্থে সৈকতে সার্বক্ষণিক হেল্প ডেস্ক চালু রাখার পাশাপাশি হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁয় অতিরিক্ত ভাড়া বা হয়রানি রোধে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, লাইফগার্ড ও ট্যুরিস্ট পুলিশ পর্যটকদের সমুদ্রে নামার আগে জোয়ার-ভাটার পতাকা দেখে নেওয়া এবং রাতের বেলা অন্ধকার সংযোগ সড়ক এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে ট্যুরিস্ট পুলিশের হটলাইন নম্বরে (০১৩২০১৬০০০০) যোগাযোগের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
কক্সবাজার বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের প্রাণ। এই মহামূল্যবান সম্পদকে রক্ষা করতে এবং পর্যটকদের জীবন ও মালের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, পৌরসভা এবং পর্যটন মন্ত্রণালয়কে এখনই সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে—এমনটাই প্রত্যাশা দেশের সর্বস্তরের জনগণের।