
শাব্বির আহমদ
জেলা প্রতিনিধি খুলনা
বাংলাদেশ আইন সহায়ক পরিষদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এডভোকেট ফারজানা ইয়াসমিন রাখির ত্যাগ ও ভূমিকার প্রশংসা করা হলেও একই সঙ্গে এডভোকেট মাহবুবুর রহমান হিরনকে ‘গুপ্ত জামায়াত’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়, পরিবার ও পেশাগত কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রকাশিত এসব বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন এডভোকেট হিরন।
তাঁর দাবি, ২০১৬ সাল থেকে প্রকাশ্যে আওয়ামীপন্থী আইনজীবী রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পরও তাঁকে ‘গুপ্ত জামায়াত’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, আওয়ামী লীগপন্থী কর্মকাণ্ড এবং দুঃসময়ে নেতা-কর্মীদের পাশে থাকার ইতিহাসকে আড়াল করার অপচেষ্টা।
নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়ে এডভোকেট হিরন জানান, ৯ আগস্ট ২০১৬ ঢাকা মেট্রোপলিটন বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, ঢাকা মেট্রোবার শাখার আহ্বায়ক মরহুম এডভোকেট জামাল হোসেন এবং সদস্য সচিব এডভোকেট সামসুর রহমানের হাত ধরে তিনি আওয়ামীপন্থী আইনজীবী রাজনীতিতে যুক্ত হন।
এরপর দীর্ঘদিন বার রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি ২০২৩-২০২৪ ও ২০২৪-২০২৫ মেয়াদের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ সমর্থিত সাদা প্যানেল থেকে এবং সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের মনোনয়নে নির্বাচনে অংশ নিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোটে সহ-সাধারন পদে নির্বাচিত হন।
শুধু বার রাজনীতিতেই নয়, ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ্য ছিল বলে জানান এডভোকেট হিরন। যশোর-৪ আসনের নৌকার প্রার্থীর পক্ষে আইনি লড়াই শেষে তিনি এলাকায় ফিরে সরাসরি নির্বাচনী মাঠে নামেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট ক্যাম্পেইন, মিছিল, সভা ও মিটিংয়ে অংশ নিয়ে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন বলে তাঁর দাবি।
এ বিষয়ে সিদ্ধিপাশা ইউনিয়ন ও অভয়নগর উপজেলার বিভিন্ন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলেও তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
স্থানীয়ভাবে আরও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলা ছাত্রলীগ ও অন্যান্য অংগসংগঠনের বিভিন্ন পদধারী নেতা ও কর্মীরা এডভোকেট হিরনকে অভিনন্দন জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছেন। ফলে দীর্ঘদিনের প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পর তাঁকে ‘গুপ্ত’ পরিচয়ে চিহ্নিত করার অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের কেউ কেউ।
এডভোকেট হিরনের ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট ২০২৪ সরকার পরিবর্তনের পরদিন, ৬ আগস্ট, তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন বার অ্যাসোসিয়েশনের রানিং সহ-সাধারণ সম্পাদক থাকা অবস্থায় তাঁর অফিস ভাঙচুর ও অবৈধভাবে দখল করা হয়। তাঁর দাবি, ল্যাপটপ, নগদ অর্থসহ প্রায় চার লাখ টাকার মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত বা লুট হয়। তাঁর ব্যক্তিগত চেম্বারেও হামলা চালানো হয়। তিনি আরও জানান, তাঁর অফিস ও চেম্বারে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবি ভাঙচুর করা হয়।
এরপর বিভিন্ন স্থান থেকে মৃত্যুর হুমকি পাওয়ায় তিনি বার প্রাঙ্গণে যাওয়া বন্ধ করেন। জীবননাশের আশঙ্কায় ২৭ আগস্ট ২০২৪ দেশ ছাড়েন এবং ৫ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন। তাঁর বক্তব্য, বিদেশযাত্রার সঙ্গে মামলার অর্থ বা ‘মামলা করে টাকা আয়’-এর কোনো সম্পর্ক ছিল না; বরং সেটি ছিল জীবন রক্ষার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত। ওই সময় তাঁর পক্ষে নিয়মিত মামলা পরিচালনার সুযোগও ছিল না।
দেশে ফেরার পর সুপ্রিম কোর্টে নিয়মিত প্র্যাকটিস শুরু করেন। রাজনৈতিক হয়রানি ও মিথ্যা মামলায় আক্রান্ত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের আইনি সহায়তায় এগিয়ে আসেন বলে জানান এডভোকেট হিরন। তাঁর দাবি, কয়েকশ নেতা-কর্মীর মামলা ও জামিনে তিনি আইনি সহায়তা দিয়েছেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো পারিশ্রমিক নেননি। অনেক মামলায় মামলা দায়ের, জামিনের আদেশ পাঠানোসহ আনুষঙ্গিক খরচও নিজের পকেট থেকে বহন করেছেন।
এর সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বৃহস্পতিবার যশোর বারের দুজন প্রবীন আইনজীবী মামলা তিনি সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে পরিচালনা করেছেন।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর পেশাগত কর্মকাণ্ডকে ‘জামিন বাণিজ্য’ হিসেবে উপস্থাপনেরও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন এডভোকেট হিরন।
তাঁর প্রশ্ন, যদি তিনি সত্যিই কোনো গোপন রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করতেন, তাহলে ২০১৬ সাল থেকে প্রকাশ্যে আওয়ামীপন্থী আইনজীবী রাজনীতি, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, নৌকার পক্ষে নির্বাচনী মাঠে অবস্থান এবং দুঃসময়ে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের আইনি সহায়তার এতগুলো ঘটনা কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে?
এডভোকেট হিরন জানান, তিনি ২০০৭ সালে এইচএসসি পাস করে বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তবে ছাত্রজীবনে তিনি কখনো ছাত্রশিবির বা অন্য কোনো ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না।
৮ আগস্ট ২০২৪-এর একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনেরও প্রতিবাদ করেন এডভোকেট হিরন।
তাঁর ব্যাখ্যা, সেটি ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ব্যঙ্গাত্মক ও প্রতিবাদী বক্তব্য। এমন এক সময়ে যখন বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করাও অনেকের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, তখন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ব্যঙ্গ করেই ওই পোস্ট দেওয়া হয়েছিল।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ডে তাঁর অবস্থান ছিল প্রকাশ্য। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ধারাবাহিকভাবে তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার পক্ষে বিভিন্ন পোস্ট, বক্তব্য ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়েছে।
এসব পোস্টের তারিখ ও বক্তব্যই প্রমাণ করে, সরকার পরিবর্তনের পর তিনি রাজনৈতিক অবস্থান গোপন করে অন্য কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করেননি।
এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের পর আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল বলে তিনি জানান। আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের নিয়ে আয়োজিত ইফতার মাহফিল সফল করতে তিনি কাজ করেন।