
শাব্বির আহমদ :-
সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এটি একটি ব্রত, জাতির বিবেককে জাগ্রত করার কঠিন দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যুগে যুগে অনেক সাংবাদিককে চূর্ণ করতে চেয়েছে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট শক্তি। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের মেরুদন্ড কখনোই ক্ষমতা বা ভয়ের কাছে নমিত হয় না। তেমনি এক নির্ভীক, আপসহীন এবং আদর্শবান সাংবাদিকতার প্রতীক ছিলেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজের সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন গাজী।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলের নির্মম রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং দমনপীড়নের শিকার হয়ে দীর্ঘ কারাবাস ও শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর পান্থপথের বিআরবি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই লড়াকু সাংবাদিক নেতা। তাঁর জীবন, সংগ্রাম, কারাবাস এবং প্রস্থান কেবল একজন ব্যক্তির প্রস্থান নয়; এটি স্বাধীন সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক বেদনাবিধূর ও কালো অধ্যায়ের দলিল।
১৯৫৩ সালে চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার গোবিন্দিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রুহুল আমিন গাজী। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রগতিশীল চিন্তা এবং ন্যায়পরায়ণতার সাথে যুক্ত ছিলেন। শিক্ষাজীবনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ১৯৭৪ সালে তৎকালীন সময়ের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাকে রিপোর্টার হিসেবে তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু করেন।
এরপর দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি পেশাদারিত্ব, সততা ও সাহসিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম দৈনিক সংগ্রামে বিশেষ প্রতিনিধি ও চিফ রিপোর্টারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
রুহুল আমিন গাজী কেবল একজন রিপোর্টারই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাংবাদিক সমাজের দূরদর্শী এক অভিভাবক ও প্রাণপুরুষ। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের বিভিন্ন আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
তিনি বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন-ডিইউজে-এর সভাপতি ও মহাসচিব, সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সাথে পালন করেছেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি ফ্যাসিবাদ ও অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার পেশাজীবী সংগঠন ‘সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের’ সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
তাঁর এই দীর্ঘ নেতৃত্বে সাংবাদিকরা বারবার খুঁজে পেয়েছেন তাদের অধিকার রক্ষার নিরাপদ আশ্রয়স্থল। হুমকি-ধমকি, লোভ-লালসা কিংবা নির্যাতন—কোনো কিছুই তাঁকে সত্য প্রকাশ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ভয়ের ঊর্ধ্বে থেকে সাংবাদিকতা করার যে মন্ত্র তিনি ধারণ করেছিলেন, তা তাঁকে সাংবাদিক সমাজে এক অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করেছিল।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের শাসনামলে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ করার যে মহোৎসব শুরু হয়েছিল, তার নির্মম শিকারে পরিণত হন রুহুল আমিন গাজী। বাকস্বাধীনতা হরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত কুখ্যাত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’-এর মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় তাঁকে কারাবন্দি করা হয়।
স্বৈরাচারী সরকারের রোষানলে পড়ে টানা আঠারো মাসেরও বেশি সময় তাঁকে কারা প্রকোষ্ঠে কাটাতে হয়। কারাগারে থাকাকালীন ন্যূনতম মানবিক সুচিকিৎসা থেকেও তাঁকে বঞ্চিত রাখা হয়। একাত্তরের বন্দিশালার মতো অমানবিক পরিবেশে ধুঁকে ধুঁকে কাটতে থাকে তাঁর দিন।
কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দীর্ঘ বন্দিদশায় রুহুল আমিন গাজীর শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যেতে থাকে। ইতোপূর্বের নানা জটিলতার পাশাপাশি কারাগারে থাকাবস্থায় তাঁর শরীরে বাসা বাঁধে একের পর এক মারাত্মক রোগ। কিডনির কার্যক্ষমতা কমতে শুরু করলেও প্রয়োজনীয় উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস তাঁর শরীরকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। তীব্র পিঠের ব্যথা এবং শরীরে লবণ ঘাটতিজনিত মারাত্মক অসুস্থতায় তিনি প্রায়শই শয্যাশায়ী হয়ে পড়তেন।
পরিবার এবং সহকর্মীরা বারবার তাঁর মুক্তির জন্য এবং সুচিকিৎসার জন্য আইনি লড়াই চালালেও ফ্যাসিস্ট বিচারব্যবস্থা ও সরকারের নির্দেশে তা বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়। মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী খেলায় মেতে উঠেছিল তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী। যখন তাঁর শারীরিক অবস্থা সম্পূর্ণ সঙ্কটাপন্ন এবং জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার উপক্রম, ঠিক তখনই নামমাত্র জামিন মেলে তাঁর। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে; কারাবাসের নির্মম যাতনা ও অসুস্থতা তাঁর জীবনকে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছিল।
২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) রাতে রাজধানীর পান্থপথে বিআরবি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি আল্লাহ তায়ালার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।
তাঁর এই প্রস্থানে দেশ হারাল একজন দেশপ্রেমিক সত্যসন্ধানী সাংবাদিককে, আর সাংবাদিক সমাজ হারাল তাদের সবচেয়ে আস্থার প্রতীক ও অভিভাবককে। মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেছেন তাঁর কর্মময় জীবনের অমোঘ স্বাক্ষর, যা তাঁকে যুগের পর যুগ বাঁচিয়ে রাখবে।
রুহুল আমিন গাজী এমন একজন ক্ষণজন্মা মানুষ, যিনি ক্ষমতার মোহে অন্ধ হননি, বরং আমৃত্যু লড়ে গেছেন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের শিখিয়ে দেয় কীভাবে মেরুদন্ড সোজা করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হয়।
ফ্যাসিস্ট সরকারের জেল-জুলুম ও শারীরিক নির্যাতনও তাঁর আপসহীন চেতনাকে দমাতে পারেনি। তাঁর এই আত্মত্যাগ এবং সাহসিকতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য পেশাগত সততা ও নৈতিকতার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। জাতি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তাঁর এই অবদান স্মরণ করবে। মহান রাব্বুল আলামীন এই মহান সাংবাদিককে জান্নাতুল ফেরদাউসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন এবং তাঁর শোকাহত পরিবার ও সাংবাদিক সমাজকে এই শোক সহ্য করার তৌফিক দান করুন।