
সুপরিচিত কবি, কথা-সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, সম্পাদিকা, ছড়াকার ও কণ্ঠশিল্পী *মাধুরী ব্যানার্জীর* লেখা অণুগল্প: *অভিমানের মেঘ*
*অভিমানের মেঘ*
*-মাধুরী ব্যানার্জী*
সেদিন সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা। রোদ আছে, অথচ রোদের উজ্জ্বলতা নেই। ঠিক যেমন মেঘার মন—আলো আছে, অথচ আনন্দ নেই।
অভিমান করে জানালার পাশে বসে ছিল মেঘা। হাতে একটা পুরোনো বই, কিন্তু চোখ আটকে ছিল রাস্তার দিকে। বারবার মনে হচ্ছিল, রাহুল হয়তো আসবে। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো, কেউ এল না।
অথচ গতকালও রাহুল বলেছিল,
—“কাল তোমার সঙ্গে একটা জরুরি কথা আছে। অপেক্ষা করো।”
সেই কথাটুকুই মেঘার মনে আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছিল।
বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামল। ফোনটা হাতে নিয়ে কতবার যে রাহুলের নামের ওপর আঙুল থেমেছে, তার হিসাব নেই। ফোন করার ইচ্ছে হয়েছে, কিন্তু অভিমান বারবার হাত সরিয়ে দিয়েছে।
শেষে নিজেকেই বলল,
—“যার আসার কথা, সে যদি না আসে, তবে আমি কেন অপেক্ষা করব?”
রাত বাড়ল।
হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
মেঘা চমকে উঠল। দরজা খুলে দেখল রাহুল দাঁড়িয়ে আছে। ভিজে জামাকাপড়, ক্লান্ত মুখ, হাতে একটা ছোট্ট প্যাকেট।
মেঘা মুখ ঘুরিয়ে বলল,
—“এত রাতে আসার কী দরকার ছিল?”
রাহুল কিছু বলল না। প্যাকেটটা মেঘার হাতে দিয়ে ধীরে বলল,
—“তোমার জন্য এনেছিলাম।”
মেঘা প্যাকেট খুলে দেখল—একটি নীল শাড়ি।
তার চোখে জল এসে গেল।
রাহুল মৃদু হেসে বলল,
—“আজ তোমার জন্মদিন। মনে আছে তো?”
মেঘা স্তব্ধ হয়ে গেল। সত্যিই আজ তার জন্মদিন। কিন্তু রাহুল তো সারাদিন কোনো খবরই নেয়নি!
রাহুল এবার জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“সকালে তোমার জন্য এই শাড়িটা কিনতে বেরিয়েছিলাম। ফেরার পথে বাবার হঠাৎ অসুস্থতার খবর পেলাম। হাসপাতালে ছুটতে হয়েছিল। ফোনটাও চার্জ ছিল না। সারাদিন তোমার কাছে আসতে পারিনি। কিন্তু তোমাকে ভুলিনি।”
মেঘার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
সে আস্তে বলল,
—“একটা ফোন করতে পারতে…”
রাহুল মাথা নিচু করে বলল,
—“পারিনি। আর সেই না-পারাটাই হয়তো আমার ভুল।”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
বাইরে তখন হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মেঘলা আকাশের বুক চিরে বিদ্যুতের আলো জ্বলে উঠছে।
মেঘা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর ধীরে বলল,
—“আমিও ভুল করেছি। তোমার ওপর রাগ করে একটা কথাও জানতে চাইনি।”
রাহুল মৃদু হেসে বলল,
—“অভিমান থাকুক, কিন্তু তার আড়ালে মানুষটাকে যেন হারিয়ে না ফেলি।”
মেঘা তাকিয়ে রইল তার দিকে।
বাইরে বৃষ্টি তখন থেমে এসেছে। আকাশের কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো উঁকি দিচ্ছে।
মেঘা বুঝল—অভিমান আসলে ভালোবাসারই এক নীরব ভাষা। তবে সেই ভাষা যদি দীর্ঘ হয়, কখনও কখনও তার আড়ালে সত্যিকারের ভালোবাসাটাও হারিয়ে যেতে পারে।
সে নীল শাড়িটা বুকে জড়িয়ে বলল,
—“চলো, আজ আমার জন্মদিনটা আবার শুরু করি।”
রাহুল হাসল।
আর জানালার ওপারে, ধীরে ধীরে সরে গেল অভিমানের মেঘ।