
সুপরিচিত কবি, কথা-সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, সম্পাদিকা, ঔপন্যাসিক, কণ্ঠশিল্পী ও ছড়াকার *মাধুরী ব্যানার্জীর* লেখা অণুগল্প : *প্রতিদান*
*প্রতিদান*
*-মাধুরী ব্যানার্জী*
বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় বসে প্রতিদিন বিকেলে সূর্যাস্ত দেখতেন অমলেন্দুবাবু। হাতে থাকত একটি পুরোনো ডায়েরি, আর চোখের সামনে ভেসে উঠত অতীতের কত ছবি।
ছেলেকে মানুষ করতে গিয়ে তিনি নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা কখনও ভাবেননি। স্ত্রী চলে যাওয়ার পর একাই সংসার সামলেছেন। ছেলের পড়াশোনা, চাকরি, বিয়ে—সবকিছুতেই নিজের সঞ্চয় উজাড় করে দিয়েছেন।
ছেলে অর্ণব বিদেশে চাকরি পাওয়ার পর প্রথম কয়েক মাস নিয়মিত ফোন করত। তারপর ফোনের ব্যবধান বাড়তে লাগল। একদিন অর্ণব বলল,
“বাবা, তোমার জন্য একটা ভালো ব্যবস্থা করেছি। শহরের এই বৃদ্ধাশ্রমটা খুব ভালো। তোমার একাকিত্বও থাকবে না।”
অমলেন্দুবাবু কিছু বলেননি। শুধু মৃদু হেসে বলেছিলেন,
“তুই ভালো থাকিস, বাবা।”
তারপর কেটে গেছে পাঁচ বছর।
এক বর্ষার সন্ধ্যায় বৃদ্ধাশ্রমের দরজায় একটি যুবক এসে দাঁড়াল। জামাকাপড় ভিজে একাকার, চোখে উৎকণ্ঠা।
“অমলেন্দু সেন এখানে থাকেন?”
কর্মচারী বললেন, “ওই যে বারান্দায় বসে আছেন।”
যুবকটি ছুটে গিয়ে তাঁর পায়ে হাত রাখল।
অমলেন্দুবাবু অবাক হয়ে বললেন, “কে তুমি?”
যুবকটি মাথা তুলে বলল, “আমি রাহুল। অর্ণববাবুর ছেলে।”
অমলেন্দুবাবুর বুকটা কেঁপে উঠল।
“অর্ণব কেমন আছে?”
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “বাবা নেই, দাদু। কয়েক মাস আগে চলে গেছে।”
নীরবতা নেমে এল।
“শেষ সময়ে বাবা আপনার কথাই বলত। বলত—‘আমি বাবার ভালোবাসার প্রতিদান দিতে পারিনি।’”
অমলেন্দুবাবুর চোখ ভিজে উঠল।
রাহুল তাঁর হাত ধরে বলল, “দাদু, আমি আপনাকে বাড়ি নিয়ে যেতে এসেছি।”
“তোমার বাবা তো আমাকে এখানে রেখে গিয়েছিল।”
“হ্যাঁ,” রাহুল মাথা নিচু করল, “কিন্তু আমি তাঁর ভুলের প্রতিদান ভুল দিয়ে দিতে চাই না।”
অমলেন্দুবাবু অনেকক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ডায়েরির একটি পাতা খুলে রাহুলের হাতে দিলেন।
সেখানে লেখা—
“ভালোবাসার প্রতিদান ভালোবাসা দিয়েই দিতে হয়। দেরি হয়ে গেলেও।”
রাহুল চোখের জল মুছে দাদুর হাত শক্ত করে ধরল।
সেদিন বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় সূর্যাস্তটা অমলেন্দুবাবুর কাছে অন্যরকম মনে হলো। মনে হলো, জীবনে দেওয়া ভালোবাসা কখনও হারিয়ে যায় না—কখনও না কখনও, কোনো না কোনো হৃদয় থেকে তার প্রতিদান ফিরে আসে।